শনিবার, ২৯ মার্চ, ২০২৫

বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ৬ ।। হোমেন বরগোহাঞি ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস (Basudeb Das)

বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন

হোমেন বরগোহাঞি

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস (Basudeb Das)





ছয়

সাংবোস্টন থেকে ফিলাডেলফিয়ায়

(৬)

 বেঞ্জামিন যদিও জেমসের নিজের ভাই ছিল তথাপি জেমস ভাইয়ের সঙ্গে নিজের অধীনস্থ কর্মচারীর মতো ব্যবহার করতেন। ছাপাখানার মালিক হিসেবে তিনি অন্যান্য কর্মচারীদের কাছ থেকে যতটুকু কাজ এবং যে ধরনের বাধ্যতা দাবি করতেন ঠিক ততটাই তিনি দাবি করেছিলেন নিজের ভাইয়ের কাছ থেকেও। বেঞ্জামিন এই কথাটা মোটেই পছন্দ করেন নি। জেমস তাকে করতে দেওয়া কতগুলি কাজ তিনি অতিশয় অপমানজনক বলে মনে করেছিলেন।ফলে দাদা-ভাই দুজনের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়াঝাটির সৃষ্টি হত। জেমস কিছুটা রাগী প্রকৃতির লোক ছিলেন।মাঝে মাঝে তিনি ভাইকে মারধরও করতেন।পরিস্থিতি ক্রমশ অসহ্য হয়ে উঠায় বেঞ্জামিন ছাপাখানার চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবলেন। কিন্তু সেটা করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না, কারণ একুশ বছর না হওয়া পর্যন্ত তিনি দাদার ছাপাখানায় চাকরি করতে চুক্তিবদ্ধ ছিলেন।

 কিন্তু ঘটনাক্রমে বেঞ্জামিনের মনস্কামনা পূর্ণ হওয়ার একটা সুযোগ এসে গেল।The New England Courant এর কোনো একটি সংখ্যায় বোস্টনের বিধান পরিষদকে সমালোচনা করে লেখা একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। কাগজটির সম্পাদক জেমস প্রবন্ধ লেখকটির নাম প্রকাশ করতে রাজি না হওয়ায় তাকে বিধানসভার অধ্যক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী এক মাসের জন্য কারাদণ্ড দেওয়া হল। জেমসের অনুপস্থিতে বেঞ্জামিনকেই অস্থায়ীভাবে কাগজটি চালাতে হল। বেঞ্জামিন দাদার নানা কথায় অসন্তুষ্ট ছিল যদিও বোস্টনের শাসকরা খবরের কাগজের একজন সম্পাদককে এভাবে নিগ্রহ করা কার্যকেও সমর্থন করতে পারেননি। সেই জন্য কাগজটির সম্পাদনা করার অস্থায়ী দায়িত্ব গ্রহণ করেই বেঞ্জামিন শাসকদের আক্রমণ করে লেখা প্রবন্ধ প্রকাশ করতে লাগলেন। এর আগেও তিনি শ্রীমতি সাইলেন্স ডগ উডের ছদ্মনামে শাসকদের স্বৈরাচার এবং আতিশয্যের সমালোচনা করে প্রবন্ধ লিখেছিলেন।

 এক মাস পরে জেমস জেল থেকে মুক্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন; কিন্তু বিধানসভা এই বলে হুকুম জারি করল যে জেমস ফ্রাঙ্কলিন The New England Courant নামের খবরের কাগজটা প্রকাশ করতে পারবেন না। এইরকম পরিস্থিতিতে কাগজটি বেঞ্জামিনের নামে প্রকাশ করা ছাড়া জেমসের অন্য কোনো উপায় ছিল না। এই উদ্দেশ্যে জেমস এবং বেঞ্জামিনের মধ্যে থাকা চুক্তিপত্রটি নতুন করে করতে হল, কারণ পুরনো চুক্তি-পত্র মতে বেঞ্জামিন একজন মাত্র শিক্ষানবিশ ছিলেন আর জেমস ছিলেন প্রকাশক। নতুন করে কোনো অভিযোগে যদি কাগজটি পুনরায় বিচারের সম্মুখীন হতে হয় এবং খানা তল্লাশির ফলে পুরোনো চুক্তিপত্রটা বিচারকের হাতে পড়ে, তাহলে বিধান সভার আদেশ উপেক্ষা করে জেমসই কাগজটির প্রকাশক হয়ে থাকা বলে প্রমাণিত হবে।

 বেঞ্জামিন কাগজটির প্রকাশক তথা স্বত্বাধিকারী হল সত্যি, কিন্তু তখনও দাদা তার ওপরে খবরদারি চালাতে ছাড়ল না। দুজনের মধ্যেই আগের মতো ঝগড়াঝাটি চড় থাপ্পড় চলতে থাকল। কিন্তু এখন যেহেতু বেঞ্জামিন কাগজটির মালিক, অন্তত নামে, সেই জন্য তিনি আগের মতো দাদার শাসন মেনে চলল না। ফলে দুজনের মধ্যে মনোমালিন্য বেড়ে চলল। অবশ্য এখানে বেঞ্জামিনের মহত্ত্ব যে দাদার সঙ্গে চলতে থাকা এই মনমালিন্যের জন্য তিনি কেবল দাদাকে দোষ দেননি। সব সময় আত্ম-সমালোচনা করে নিজের স্বভাব চরিত্র উন্নত করতে বেঞ্জামিন নিজেও আত্মজীবনীতে স্বীকার করেছেন যে দাদা তার ওপরে সব সময় ক্রুদ্ধ হয়ে থাকার জন্য তিনি নিজের স্বভাবকেও কিছু পরিমাণে দায়ী করেছেন।

 সে যাই হোক না কেন, বেঞ্জামিনের প্রতি দাদার দুর্ব্যবহার ক্রমশ এতটা বেড়ে চলল যে তা অবশেষে সহ্যের অতীত হল। তিনি ছাপাখানার চাকরি ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলেন। জেমস যখন জানতে পারল যে ভাই তার সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করার জন্য মনস্থির করে নিয়েছে তখন তিনি বোস্টনের ছাপাখানার মালিকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বেঞ্জামিনকে তাদের ছাপাখানায় চাকরি না দিতে অনুরোধ করলেন। বেঞ্জামিন তখন বুঝতে পারল যে বোস্টন ত্যাগ করে ভাগ্যের অন্বেষণে অন্য কোনো শহরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো গতি নেই।

 তিনি নিউইয়র্কে যাবার কথা ভাবলেন। নিজের বইয়ের সংগ্রহ থেকে কিছু বই বিক্রি করে জাহাজের ভাড়ার জন্য টাকা যোগাড় করলেন। তারপরে তিনি একদিন নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। তখন তার বয়স সতেরো বছর। ইতিমধ্যে তিনি ছাপাখানা পরিচালনার বিদ্যা সম্পূর্ণভাবে আয়ত্ত করে নিয়েছেন। সেই কম বয়সে তিনি একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের চেয়ে বেশি বই পড়ে ফেলেছেন। তাই ভাগ্যের অন্বেষণে তিনি যখন বাড়ি ছেড়ে বের হলেন, তখন তার একমাত্র মূলধন ছিল গভীর আত্ম-বিশ্বাস।

 সমুদ্রপথে বোস্টন থেকে নিউইয়র্কের দূরত্ব প্রায় পাঁচশো কিলোমিটার। তিন দিনে সেই পথ অতিক্রম করে বেঞ্জামিন যখন নিউইয়র্কে পা রাখলেন, তখন তার পকেট প্রায় খালি; অন্যদিকে কারও কাছ থেকে সাহায্য বা আশ্রয় চাওয়ার মতো পরিচিত কেউ নিউইয়র্কে ছিল না।

 যেহেতু বেঞ্জামিন একমাত্র ছাপাখানার কাজই ভালোভাবে জানেন, সেই জন্য তিনি নিউইয়র্কে একটা ছাপাখানা খুঁজে বের করলেন। ছাপাখানাটার মালিকের নাম উইলিয়াম ব্রেডফোর্ড। ব্রেডফোর্ডের ছাপাখানায় তখন কোনো পদ খালি ছিল না। কিন্তু তিনি বেঞ্জামিনকে চাকরি দিতে না পারলেও একটা আশার খবর জানালেন। নিউইয়র্ক থেকে একশো ষাট কিলোমিটার দূরে ফিলাডেলফিয়া শহরে ব্রেডফোর্ডের এক ছেলে থাকে। সে একটি ছাপাখানার মালিক। কিন্তু তার প্রধান সহকারীর কিছুদিন আগে মৃত্যু হয়েছে। বেঞ্জামিনকে ব্রেডফোর্ড বললেন যে তিনি যদি ফিলাডেলফিয়ায় যান, তাহলে ব্রেডফোর্ডের ছেলের ছাপাখানায় তিনি একটা চাকরি পেলেও পেতে পারেন।

 বেঞ্জামিন ফিলাডেলফিয়ায় নৌকায় যাবেন বলে স্থির করলেন। কিন্তু তার এবারের ভ্রমন ছিল অত্যন্ত দুর্যোগপূর্ণ। প্রচন্ড তুফান তার নৌকাটিকে পথচ্যুত করে লং আইল্যান্ডের দিকে ঠেলে দিল। লং আইল্যান্ডের কাছে গিয়ে তিনি দেখলেন–শিলাময় উঁচু খাড়াইতে সাগরের ফেনিল ঢেউ গুলি আছড়ে পড়ছে; সেখানে নৌকা ভিড়ানোর কোনো উপায় নেই। এদিকে মুষলধারে বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে। বাধ্য হয়ে তারা নৌকায় বসে রইল। নৌকার ছইয়ের অসংখ্য ফুটো দিয়ে বৃষ্টি পড়ে তাদেরকে কাক ভেজা করে তুলল। ক্ষুধা- তৃষ্ণা তাদেরকে আধ-মরা করে ফেলল, কারণ প্রায় ত্রিশ ঘন্টা তাদের পেটে একটা দানাও পড়েনি। বিকেলের দিকে বেঞ্জামিনের তীব্র কম্পণের সঙ্গে জ্বর এল।

 রাতের দিকে জ্বর কিছুটা কমল। অন্য একটি পথ দিয়ে নৌকা পারে লাগিয়ে বেঞ্জামিন সেখান থেকে আশি কিলোমিটার দূরের বার্লিংটন নামের শহরে পায়ে হেঁটে যাত্রা করলেন।বার্লিংটন থেকে ফিলাডেলফিয়া নৌকায় যাওয়া যায় বলে তিনি জানতে পেরেছিলেন।

 বার্লিংটন যাওয়া পথটাও খুব একটা সুখের ছিল না। সারাদিন আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরে পড়ছিল।ক্ষুধা আর ক্লান্তিতে বেঞ্জামিন আধমরা হয়ে পড়েছিলেন।তার চেহারা এরকম হয়েছিল যে লোকেরা তাকে কারও বাড়ি থেকে পালিয়ে আসা চাকর বলে সন্দেহ করেছিল। এভাবে অশেষ দুঃখ কষ্ট সহ্য করে তিনি একদিন বারলিংটনে পৌছালেন এবং সেখান থেকে ফিলাডেলফিয়া যাওয়া নৌকায় উঠে তিনি অবশেষে তার গন্তব্যস্থল অর্থাৎ ফিলাডেলফিয়ায় পা রাখলেন।

 ক্ষুধায় আধমরা হয়ে এবং হাতে একটিও কড়ি না থাকা অবস্থায় ফিলাডেলফিয়ায় এসে উপস্থিত হওয়ার দিন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন কি কল্পনা করতে পেরেছিলেন যে সেই দরিদ্র এবং অজ্ঞাত কুলশীল ভাগ্যান্বেষী যুবক শহরে প্রথম পা দেওয়ার ঘটনাটিকে চির স্মরণীয় করে রাখার জন্য ভবিষ্যতে ফিলাডেলফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে তার বিশাল মূর্তি স্থাপন করা হবে?


বুধবার, ২৬ মার্চ, ২০২৫

Soumyadip Roy: The Rising Star of India's Literary and Cinematic World, Dr. Dipali Maity , Literature, Cinema,

Soumyadip Roy: The Rising Star of India's Literary and Cinematic World

Dr. Dipali Maity 



Born on August 31, 2007, in the quiet town of Ghatal, West Bengal, Soumyadip Roy is quickly making a name for himself as one of India's youngest poets, actors, and writers. At just 17 years old, his achievements have already made him a remarkable figure in the world of literature and cinema, proving that age is no barrier to talent and creativity.

A Poet Beyond His Years

Soumyadip's journey into the world of literature began at a young age. By the age of 9, he had already written a collection of rhymes, which culminated in the release of his debut book,Ultopalta. This book, which translates to Upside Down, is a unique compilation of poems that reflect his early perspective on the world. The rhymes are both playful and insightful, a testament to his innate ability to craft language in a way that resonates with readers of all ages.

His early literary accomplishments caught the attention of several media outlets, including Ananda Bazar Patrika, one of India's leading newspapers. The newspaper recognized him as one of the youngest poets to publish a book at such a tender age, a milestone that many aspiring writers only dream of reaching.

In addition to his book, Soumyadip's poetry has appeared in numerous magazines, further establishing him as a young literary prodigy. His work continues to be recognized for its depth and ability to engage readers, making him a prominent voice in contemporary Indian poetry.

Awards and Recognitions

Soumyadip's literary talents have earned him several prestigious awards and honors. He was awarded at the West Midnapore Book Fair 2021, where his contribution to literature was recognized. Additionally, Soumyadip has received recognition from many magazines and literary programs held in Kolkata and Midnapore, further affirming his growing reputation as a young poet and writer of note.


His work has also been acknowledged at i-Fest, a program organized by i-Society, a well-known book publishing brand, where he was celebrated for his creative achievements. Soumyadip has been honored at various events, including Medinipur Kobita Utsav,

Dursanket (held in Kolkata), and numerous other local literary festivals in the region, where his contributions to the literary world continue to inspire both young and seasoned artists alike.

A Passion for Acting

While his literary work has earned him accolades, Soumyadip is also a budding actor with a passion for cinema. He has already made significant strides in the world of short films, having played lead roles in several projects. His natural flair for acting and his ability to immerse himself in diverse characters have made him a standout talent in the independent film scene.

Not only confined to short films, Soumyadip has also appeared in full-length feature films, where his performances have been noted for their maturity and emotional depth. His commitment to the craft of acting has made him a rising star in the Indian film industry, with many predicting a bright future for him on the big screen.

Education and Training



Despite his growing fame in both the literary and acting worlds, Soumyadip remains dedicated to his education. He currently attends Nava Nalanda High School in Kolkata, where he skillfully balances his studies with his artistic pursuits. His commitment to his academic work is a testament to his discipline and desire for personal growth, even as he continues to follow his passion for writing and acting.

Soumyadip is also focused on developing his acting skills. He participated in a prestigious acting workshop organized by the Film and Television Institute of India (FTII) in Pune, an institute renowned for producing some of the best actors in the country. This workshop provided him with valuable insights into the world of acting, further refining his craft and expanding his horizons as an artist.

A Bright Future Ahead

Soumyadip Roy's journey is just beginning, and the future looks incredibly bright for this young talent. With his passion for both literature and cinema, he is poised to become one of the most prominent names in India's creative industries. Whether through the written word or on the silver screen, Soumyadip's work continues to inspire and captivate, proving that age is no barrier when it comes to creativity and success.

As he continues to grow and evolve as both an artist and an individual, we can only imagine the heights Soumyadip will reach in the coming years. One thing is certain: he is a force to be reckoned with, and the world will be watching as his journey unfolds.

রবিবার, ২ মার্চ, ২০২৫

ইচ্ছে ।। দীপালি মাইতি ।। কবিতা, Dipali Maity

ইচ্ছে 

দীপালি মাইতি



বাতাসে 

এদিকে ওদিকে যায় 


রোদ-বৃষ্টিতে

হারায়

প্রসিদ্ধ ঠিকানা 



এখন সূর্যের দিকে 

মুখ তুলে দাঁড়িয়ে 

শুধুমাত্র 

অনন্ত প্রশান্তির খোঁজে

শনিবার, ১ মার্চ, ২০২৫

বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন হোমেন বরগোহাঞি মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Basudeb Das

 বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন

হোমেন বরগোহাঞি

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস





পাঁচ 

বেঞ্জামিনের আত্মশিক্ষার শুরু

 সাংবাদিক বেঞ্জামিন

 বেঞ্জামিন যখন তার দাদার ছাপাশালায় শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগ দেন তখন তার বয়স ছিল বারো বছর ।জেমস অর্থাৎ বেঞ্জামিনের দাদা নিজের ছাপাশালা থেকে ‘বোস্টন গেজেট’ নামের একটি খবরের কাগজ প্রকাশ করতেন। কাগজটা ভালো চলল না। জেমস সেটি অন্যকে বিক্রি করে দিয়ে The New England Courant নামের একটি নতুন খবরের কাগজ প্রকাশ করলেন। সেই কাগজে বিভিন্ন ধরনের প্রবন্ধ লিখতে শুরু করে বেঞ্জামিন ১৬ বছর বয়সে নিজের সাংবাদিক জীবনের সূত্রপাত করেন।

 কিন্তু বেঞ্জামিনকে প্রবন্ধ গুলি লিখতে হয়েছিল ছদ্মনামে।নিজের নামে লিখলে দাদা তার লেখা না ছাপাতে পারে বলে তার মনে শঙ্কা ছিল।ছদ্মনাম হিসেবে তিনি বেছে নিলেন একজন মহিলার নাম— শ্রীমতি সাইলেন্স ডগ উদ।শ্রীমতি ডগ উদ লিখতে শুরু করে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন এই বলে —‘আমি অনাচারের শত্রু এবং সদাচারের বন্ধু।’ ছদ্মনামে বেঞ্জামিন যে সমস্ত প্রবন্ধ এবং ব্যঙ্গ রচনা লিখেছিলেন সেই গুলিতে তিনি মানুষকে নানা নৈতিক উপদেশ দেবার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত ধরনের সামাজিক সমস্যা আলোচনা করে সেইগুলির সমাধানের পথ দেখাতে চেষ্টা করেছিলেন।বেঞ্জামিন তাঁর সময়ের তুলনায় যথেষ্ট অগ্রণী ছিলেন ।সেই ষোলো বছরের ছেলেটি তখনই ধর্মীয় ভণ্ডামির কঠোর সমালোচনা করেছিলেন এবং নারী শিক্ষার সপক্ষে উকালতি করেছিলেন। তাঁর সমালোচনা মূলক ব্যঙ্গ রচনা গুলি পড়ে সমাজের মুখ্য ব্যক্তিরা ক্রোধে জ্বলে উঠেছিলেন; কিন্তু অন্যদিকে সেই রচনা গুলি The New England Courant কে করে তুলেছিল বোস্টনের সবচেয়ে জনপ্রিয় খবরের কাগজ।

  বেঞ্জমিনের এই বয়সের আরও একটি বিশেষ ঘটনার কথা এইখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, কারণ ঘটনাটি তার মানসিকতা বুঝতে আমাদের সাহায্য করবে।

  জ্ঞানের সন্ধানে বিভিন্ন বিষয়ের বই পড়াটা ছিল বেঞ্জামিনের নেশা বা অভ্যাস। প্রায় ষোলো বছর বয়সে তিনি কোনো একজন ট্রায়ন নামের লেখক লেখা একটি বই পড়ার সুযোগ পেলেন। বইটিতে আমিষ আহারের চেয়ে নিরামিষ আহারকে স্বাস্থ্যের জন্য বেশি হিতকর বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। লেখকের যুক্তিতে বিশ্বাস করে বেঞ্জামিন আমিষ আহার ত্যাগ করে নিরামিষাশী হওয়া স্থির করলেন। কিন্তু সেই ক্ষেত্রে একটি সমস্যা দেখা দিল। তার দাদা অর্থাৎ ছাপাশালার মালিক জেমস মা-বাবার সঙ্গে না থেকে নিজের কর্মচারী এবং শিক্ষানবিশদের সঙ্গে আলাদাভাবে মেস করে থাকতেন। বেঞ্জামিন তাদের সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু বেঞ্জামিন নিরামিষ আহার খাবেন বলে ঠিক করার ফলে তার জন্য আহার আলাদাভাবে রান্না করতে হল। জেমস সেই কথায় অসন্তুষ্ট হলেন। তখন বেঞ্জামিন দাদাকে এই বলে প্রস্তাব দিলেন যে বেঞ্জামিনের খাবার জন্য সপ্তাহে যতটুকু টাকা খরচ হয় তার মাত্র আধা টাকা যদি জেমস বেঞ্জামিনকে দিতে রাজি হয়, তাহলে তিনি নিজের আহার নিজেই রান্না করে খাওয়ার ব্যবস্থা করবেন। জেমস সেই প্রস্তাবে রাজি হলেন। বেঞ্জামিন তখন ট্রায়নের বইটি পড়ে নিরামিষ আহার প্রস্তুত করার কয়েকটি সহজ নিয়ম শিখে নিলেন। নিরামিষ আহার খেতে আরম্ভ করে দেখলেন যে জেমসের কাছ থেকে পাওয়া টাকার অর্ধেক তার খাওয়ার জন্য খরচ হয়; বাকি আধা টাকা বেঁচে যায়।। বেঁচে যাওয়ার ফলে সেই টাকা দিয়ে তিনি আগের চেয়ে বেশি বই কিনতে সক্ষম হলেন।কেবল তাই নয়, বই পড়ার জন্য তিনি আগের চেয়ে বেশি সময় বের করতে সক্ষম হলেন।

  জেমস এবং তার কর্মচারীরা দুপুরের আহার খাওয়ার জন্য বাড়িতে যায়। সেই সময়ে বেঞ্জামিন ছাপা শালায় একা থাকেন। কয়েক টুকরো পাউরুটি বা অল্প ফল টল আর এক গ্লাস জল– এটাই হল বেঞ্জামিনের দুপুরবেলার আহার।এই লঘু আহার খেয়ে নিয়ে তিনি বই পড়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং দাদা এবং তার সঙ্গীরা কাজে ফিরে আসা না পর্যন্ত তিনি পড়াশোনা করতে থাকেন। বেঞ্জামিন বিশ্বাস করতেন যে সহজে হজম করতে পারা লঘু আহার মগজকে পরিষ্কার রাখে আর সেই অবস্থায় পড়া কথাগুলি বুঝতে বেশি সহজ হয়।

  কিন্তু বেঞ্জামিনের নিরামিষ আহারের প্রতি আসক্তি মাত্র এক বছর স্থায়ী হল। একবার তিনি বোস্টন থেকে জাহাজে উঠে কোনো একটি জায়গায় গিয়েছিলেন।সেটাই ছিল সমুদ্র ভ্রমণের তাঁর প্রথম অভিজ্ঞতা ।জাহাজের যাত্রীরা সমুদ্রের অনেক কড মাছ ধরে সেই সব ভেজে খেতে লাগলেন। ট্রায়ানের যুক্তিতে বিশ্বাস করে নিরামিষাশী হওয়ার আগে বেঞ্জামিন মাছ খেতে খুব ভালোবাসতেন। এখন ভাজা মাছের গন্ধ তার নাকে লাগার সঙ্গে সঙ্গে লোভে তার জিহ্বায় জল আসতে লাগল।কিন্তু তা বলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে লোভের কাছে নতি স্বীকার করলেন না। একদিকে তার নীতি, অন্যদিকে লোভ— এই দুটিকেই তিনি কিছু সময় দাঁড়িপাল্লার মাপতে শুরু করলেন। কী করা উচিত সেই কথা ভেবে থাকার সময় হঠাৎ একবার তাঁর মনে পড়ল যে একবার একটি বড়ো মাছের পেট চেরার সময় তা থেকে অনেক ছোটো মাছকে বেরিয়ে আসতে তিনি দেখেছিলেন।আমিষ আহারের বিপক্ষে ট্রায়নের একটি প্রধান যুক্তি ছিল এই যে আমিষ আহার খাওয়ার অর্থই হল প্রাণী হত্যা—যা নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু বড়ো মাছের পেট থেকে ছোটো মাছ বের করার দৃশ্যটি মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেঞ্জামিন নিজেকে প্রশ্ন করলেন–‘মাছগুলি যদি একে অপরকে খেতে পারে তাহলে আমি মাছ খেলে কী আর এমন অসুবিধা হবে?’

 নিজের সঙ্গে এভাবে তর্কবিতর্ক করে অবশেষে বেঞ্জামিন আশ মিটিয়ে ভাজা মাছ খেতে শুরু করলেন।

 এই সম্পূর্ণ ঘটনাটিতে বেঞ্জামিন পুনরায় মাছ খেতে শুরু করার কথাটার চেয়ে যে কথাটি বেশি তাৎপর্যপূর্ণ সেটি হল ঘটনাটির মধ্য দিয়ে ফুটে উঠা বেঞ্জামিনের যুক্তিবাদী মনের পরিচয়। তিনি নিজেই লিখে রেখে গেছেন—‘সমস্ত কথাকে যুক্তির মাধ্যমে বিচার করে দেখতে পারার ক্ষমতা থাকলে নানা প্রকারের সুবিধা হয়। তখন মানুষ যে কোনো কথার সপক্ষে বা বিপক্ষে নানা যুক্তি আবিষ্কার করতে পারে।’


মঙ্গলবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫

এ কে সরকার শাওনের ৫৮ তম জন্মদিন পালন, বাংলাদেশ, Poet

এ কে সরকার শাওনের ৫৮ তম জন্মদিন পালন

নিজস্ব সংবাদদাতা, ঢাকা



৬ ফেব্রুয়ারী ছিলো কবি ও কথাসাহিত্যিক এ কে সরকার শাওনের ৫৮ তম জন্মদিন। এইদিনে তিনি বদন বইয়ে লিখলেন

"কেক নয়, ফানুস নয় 

নয় মোম প্রজ্জ্বলন,

জীবন থেকে হারিয়ে গেলো 

আরো একটি কষ্টের সন!"


কষ্ট ভুলতে নাড়ীর টানে জন্মদিনে রাজধানীর বাড়ী ছেড়ে সস্ত্রীক সোজা চলে গেলেন জন্মভূমি সবুজ শ্যামল গ্রাম গোপালপুরে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে একটি অপরূপা গ্রাম গোপালপুর। তাঁর ভাষায়


"সমতটের রূপসী তন্বী

গোপালপুর তার নাম!

সারি সারি সুন্দর বাড়ি

শত গুনী মানীর ধাম!"


সেখানে পৈতৃক বাড়ীতে কিছুক্ষণ কাটিয়ে চলে গেলেন শস্য ক্ষেতে। সেখামে কবির কলম থেমে থাকেনি। সর্ষে ক্ষেতের হলুদ সায়রে বিমোহিত হয়ে লিখলেন 


"মৌমাছি ভ্রমর গুঞ্জে দিনভর

হলুদ সর্ষে ক্ষেতে।

বনে-জঙ্গলে পিয়া পিয়া ডাকে

পাপিয়া-মহুয়া তফাতে।"


গাঢ় সবুজ প্রচ্ছদে সফেদ ধনে পাতার ফুল নিয়ে লিখলেন 

"ধনে পাতার কী বাহার!

ঘ্রাণে আত্মহারা। 

ঘন সবুজ প্রচ্ছদে ফোঁটা

ফুলগুলি যেন তারা! "


এভাবেই "শীতের শান্ত সকাল" কবিতাটি লিখলেন ঘুরে ঘুরে। নীড় ফেরা পাখীর মত সন্ধ্যায় রাজধানীতে ফিরে এলেন। সারাক্ষণ গুনগুনিয়ে গাইলেন কালজয়ী পরিচালক সুবাস দত্তের আলিঙ্গন ছায়াছবির গান 

"ঘুরে এলাম কতো দেখে এলাম 

অশান্ত মন নিয়ে ছুটে গেলাম

আমার গাঁয়ের মতো কভু দেখিনি 

সে যে আমার জন্মভূমি। "


সাহিত্য চর্চায় নিবেদিত এই প্রতিভাবান কবি'র জন্ম ১৯৬৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের গোপালপুরে। পিতা মো: আবদুল গনি সরকার একজন সরকারী চাকুরে এবং মাতা মিসেস সালেহা গনি সরকার একজন আদর্শ গৃহিনী ছিলেন। তিনি পিতা-মাতার সাত সন্তানের মধ্যে ৪র্থ সন্তান। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি কনিষ্ঠ।


কলকাতার বাংলা এক্সপ্রেস পুরস্কার বিজয়ী কবি ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্য ও সৃজনশীল সব ধরনের ধারার সাথে জড়িত আছেন। তাঁর লিখা গান, কবিতা, নাটক, টেলিফিল্ম ইত্যাদি দেশে বিদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়-হচ্ছে। তাঁর প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলি হচ্ছে যথাক্রমে “কথা-কাব্য”, “নীরব কথপোকথন”, ও "আপন-ছায়া"। ২০২৫ সালের বই মেলায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস " অতল জলে জলাঞ্জলি। এই উপন্যাসে তিনি ভিনদেশী শব্দ সম্পূর্ণভাবে পরিহার করেছেন। তাঁর একটি গল্পগ্রন্থ সহ অপ্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ৯। কবি'র শিক্ষা জীবনের শুরু ঝালকাঠির উদ্বোধন উচ্চ বিদ্যালয়ে। ১৯৮৩ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও ১৯৮৫ সালে নবীনগর কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক হন। ১৯৯০ সালে বিমান বাহিনীর এটিআই থেকে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ সহযোগী প্রকৌশলীর সনদ অর্জন করেন। ১৯৯৬ সাল থেকে ১০ বছর তিনি সেই এটিআই এর প্রশিক্ষক ছিলেন। ২০০৮ সালে থাইল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অফ অ্যাসাম্পশন থেকে তথ্য প্রযুক্তিতে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রান গ্রুপ ও ইন্টারন্যাশনাল ফিনান্স কর্পোরেশন কর্তৃক প্রদত্ত "খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা" বিষয়ের উপর একাধিক সনদ রয়েছে কবি'র। এছাড়াও তিনি আইন শাস্ত্রেও সম্মান স্নাতক। সরকারি ছাড়া তিনি প্রান সহ দেশের কয়েকটি স্বনামধন্য শিল্পগ্রুপের উপ মহা-ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) হিসাবে কাজ করেন। ১৯৯১ সালে ৫ জুলাই তিনি যুগলবন্দী হন বাংলাদেশের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এ কে এম জহিরুল হক (ইব্রাহিম)সাহেবের দ্বিতীয়া কন্যার সাথে। কবি ও কবি'র শিক্ষাবিদ স্ত্রী নাজমা আশেকিন শাওনের তিন রাজকন্যাগণ বিশ্বের প্রথম সারির বনেদী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পূর্ণ মেধা বৃত্তি নিয়ে অধ্যয়ন করছেন। এবারের বাংলাদেশের বই মেলায় তাঁর প্রথম উপন্যাস অতল জলে জলাঞ্জলি প্রকাশ করে ছিন্নপত্র প্রকাশন। বইমেলায় ষ্টল ষ্টল নং ৫৯৩।সরকারি ও বেসরকারি চাকুরির পাঠ চুকিয়ে বর্তমানে তিনি রাজধানীর উত্তরখানের নিজ বাসভবন কবিকুঞ্জ 'শাওনাজ ভিলায়' নিরবে নিভৃতে সাহিত্যচর্চা করে চলোছেন ।

শনিবার, ১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫

এ কে সরকার শাওনের প্রথম উপন্যাস "অতল জলে জলাঞ্জলি" প্রকাশিত ।। নিজস্ব সংবাদদাতা, ঢাকা ।। বাংলাদেশ, Bangladdesh

এ কে সরকার শাওনের প্রথম উপন্যাস "অতল জলে জলাঞ্জলি" প্রকাশিত



নিজস্ব সংবাদদাতা, ঢাকা, ০১ ফেব্রুয়ারি ।। এ কে সরকার শাওনের প্রথম উপন্যাস "অতল জলে জলাঞ্জলি" প্রকাশিত হল। ২৪০ পৃষ্ঠার উপন্যাসটি প্রকাশ করেছে ছিন্নপত্র প্রকাশনী এবং প্রচ্ছদ একেছেন ভারতের ভুবনেশ্বরে অবস্থিত  কিট (KiiT) বিশ্ববিদ্যালয়ের এরোস্পেস ইন্জিনিয়ারিং এর মেধাবী  ছাত্রী আঁকিয়ে   কামরুন সালেহীন তৃণা।  উপন্যাসটি উৎসর্গ করেছেন কবির  তিন রাজকন্যাকে।  উপন্যাসটি ২০২৫ এর বইমেলার লিটল ম্যাগ চত্বরে, ছিন্নপত্র প্রকাশনীর স্টল নং ৫৯৩ ও রকমারিতে পাওয়া যাবে। গ্রন্থটির মূল্য রাখা হয়েছে ৭৫০ টাকা।একটি ত্রিভুজ প্রেমের কাব্যধর্মী সামাজিক উপন্যাস “অতল জলে জলাঞ্জলি” কবির ৪র্থ প্রকাশিত গ্রন্থ। গ্রন্থটি সম্পর্কে এ কে সরকার শাওন বলেন, ”এ সমাজ, সংসার ও চারপাশের আটপৌরে সুখ, দুঃখ, কান্না, হাসি ইত্যাদি ঘটনাকে উপজীব্য করেই অতল "জলে জলাঞ্জলি" র উপন্যাসের চরিত্রাবলী রূপায়ন করা হয়েছে। আশাকরি সবার হৃদয়ে আঁচড় কাটবে“। উপন্যাসের সারসংক্ষেপ হলো সমতটের মেধাবী কাব্যিক  ছেলে জগলু। বরেন্দ্রভূমিতে গিয়ে পড়াশুনা ও লেখালেখির মাঝে  পরিচয় হয় উঞ্চ পলির রাজকন্যা জুহি'র সাথে। পরিচয় ও প্রণয় ছাড়িয়ে পরিণয়ের পথে এগোতেই হোঁচট খায় দুরারোগ্য ব্যাধিতে। মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে অর্ধ-চেতনে চিকিৎসার্থে কেটে যায় প্রায় অর্ধযুগ। নব জীবনে আলো হয়ে উদ্ভাসিত হয় আর এক বিদেশী   রাজকন্যা শায়লা। ত্রিভুজ প্রেমের আবেগী কাহিনীর সমাপ্ত হয় কারো হাসি কারো কান্নায়। জীবনে কাউকে না কাউকে দিতে হয় অতল জলে জলাঞ্জলিতে বিসর্জন। উপন্যাসটিতে বিদেশী ভাষার অনুপ্রবেশ কঠোরভাবে বর্জন করা হয়েছে কলকাতার  বাংলা এক্সপ্রেস পুরস্কার বিজয়ী কবি  এ কে সরকার শাওন  ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের গোপালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন  ১৯৬৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি।  পিতা মোঃ আব্দুল গণি সরকার সরকারি চাকুরে এবং মা  সালেহা গণি সরকার আদর্শ গৃহিণী  ছিলেন। কবি'র শিক্ষা জীবনের শুরু ঝালকাঠির উদ্বোধন উচ্চ বিদ্যালয়ে।  ১৯৮৩ সালে নবীনগর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও ১৯৮৫ সালে  নবীনগর কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে  স্নাতক হন। ১৯৯০ সালে বিমান বাহিনীর এটিআই থেকে   অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ   সহযোগী প্রকৌশলীর সনদ অর্জন করেন। ১৯৯৬ সাল থেকে ১০  বছর তিনি সেই এটিআই এর প্রশিক্ষক ছিলেন। ২০০৮ সালে থাইল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অফ অ্যাসাম্পশন থেকে তথ্য প্রযুক্তিতে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন।  ইন্টারন্যাশনাল ফিনান্স কর্পোরেশন কর্তৃক প্রদত্ত "খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা" বিষয়ের উপর একাধিক সনদ  রয়েছে কবি'র। এছাড়াও তিনি  আইন শাস্ত্রেও সম্মান  স্নাতক। সরকারি ছাড়া তিনি প্রান সহ দেশের কয়েকটি  স্বনামধন্য শিল্পগ্রুপের উপ মহা-ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) হিসাবে কাজ করেন। অতল জলে জলাঞ্জলি কবি'র প্রথম উপন্যাস।  প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলো হচ্ছে  কথা-কাব্য, নীরব কথাপোকথন ও আপন-ছায়া। প্রকাশের প্রতীক্ষায় গ্রন্থগুলো হচ্ছে প্রণয়-প্রলাপ, আলো-ছায়া, চেয়ার ও চোর,  বাঁশিওয়ালা, সজনী, প্রান্তিক-প্রান্তরে, জলের নাচন, জলের ছল,  শিশুদের  জন্য বাঁকা চা়ঁদের হাসি, ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ Songs of Insane এবং দু'টো গল্পগ্রন্থ মেকআপ বক্স ও নিশুতি রাতের প্রলাপ। 


কবি ও কবি'র শিক্ষাবিদ স্ত্রী নাজমা আশেকিন শাওনের তিন রাজকন্যাগণ বিশ্বের প্রথম সারির  বনেদী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পূর্ণ মেধা বৃত্তি নিয়ে অধ্যয়ন করছেন। সরকারি ও বেসরকারি চাকুরি থেকে অবসর নিয়ে স্থায়ীভাবে বাস করছেন রাজধানীর উত্তরখানের  কবিকুঞ্জ শাওনাজ ভিলায়।

রবিবার, ৫ জানুয়ারী, ২০২৫

দারোগা বাড়ির স্মৃতিকথা ।। অণুগল্প ।। মো.রিমেল, Daroga Barir Itikatha

দারোগা বাড়ির স্মৃতিকথা

মো.রিমেল


গ্রীষ্মের সকালে দারোগা বাড়ির প্রধান ফটকে মেঘবালক দাড়িয়ে আছে। একটু পরে কৃষ্ণচূড়ার গাছের অদূরে একটা আম গাছের গুড়িতে বসে  সূক্ষ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ।

থাকার ঘরের সংকীর্ণ বাতায়নে তাকিয়ে কিছু একটা জিনিসে গভীর মনোনিবেশ করছে দারোগা বাড়ির দাদি। রতন,নিলয় মতিনরা ঢেঁকি ঘরের পূর্বদিকে মাটি খুড়ে চলছে।কারোর হাতে ছোট্ট লাঠি আবার কেউ কাঁচি নিয়ে মাটি খুড়েই চলছে। যেন রাজা গোবিন্দমানিক্য গুপ্তধন লুকিয়ে রেখেছে সে জায়গায়।

 

স্কুল ছুটি শেষে পাড়ার অনেকে খবর জানতে পেরে যোগ দিয়েছে রতন, নিলয়দের সাথে।কিন্তু কি চলছে?মেঘবালক আর দাদি কেউই অনুমান করতে পারল না।বাতায়নে দাদিকে আর দেখা যাচ্ছে না। হয়তো এই বিষয়ে নালিশ করতে গেছে তার ছেলে জসিম ও মহসিনের কাছে।

 একটু পরে রতনের উল্লাস শোনে বুঝা গেল হয়তো সে গোবিন্দমাণিক্য রাজার গুপ্তধন পাতে পেয়ে গেছে।সবাই আরো বেশি মাটি খুড়াতে ব্যস্ত, আমাকে ও পেতে হবে। রতনের খুড়াখুড়ি শেষ। মেঘবালক বলল,

“রতন কি রে?ছেলেমেয়েরা কি খুজে? আর তুই কি পেয়েছিস?

মিষ্টি আলু।

মিষ্টি আলু?

হুম।দেখছো না একপাশে মিষ্টি আলুর লতাগুলো স্তুপ করে রেখেছে। গতকাল পলাশ ভাই মিষ্টি আলু তুলেছে।

-তুলে নিলে তরা আবার কিভাবে এখন মিষ্টি আলু পাচ্ছিস?

পলাশ ভাই ভালো করে তুলে নি। অনেক আলু এখনো মাটির নিচে রয়ে গেছে।”

ঢাক-ঢোলের আওয়াজ ।রতন তার মিষ্টি আলু একটা গাছের তলায় রেখে নিলয়,মতিন নিয়ে পথের দিকে তাকাতেই দেখে একদল লোক ঢাক-ঢোল বাজিয়ে দারোগা বাড়ির দিকে আসছে।

রত্না দিদির বিয়ে উপলক্ষে পানি নিতে ঢাক-ঢোল বাজাতে বাজাতে একটা দল আসলো দারোগাবাড়ির পুকুরে। তাদের পিছু পিছু চললো রতন নিলয় মতিন সহ বাকিরা। পুকুরপাড়ে বিয়ের গীত গাইতে দেখা গেল খোকাদার মা,রাতুলের দিদি সহ পাড়ার কিছু নারীদের যেন এক উৎসমুখর পরিবেশ।নিয়ম মেনে একটা ডিম পানিতে ফেলে কলস ভরে পানি নিয়ে রওনা হলো রত্না দিদির বাড়িতে।এক পা এক পা করে এগিয়ে যাচ্ছে সবাই।ঢাক-ঢোলের আনন্দে মগ্ন হয়ে নাচতে শুরু করে দিল রাতুল নিলয়।কিন্তু একটু পরে লক্ষ্য করল মতিন নেই।বাগান,পুকুর ঘাট,উঠোন
সব জায়গায় খুজেও মতিনকে পাওয়া গেল না।রতন,নিলয় বাড়ি চলে গেল।

ঢেঁকি ঘরের পিছনে আম গাছে বেশ টসটসে রসালো আম।আমের পাকা হলদে রঙ দেখে যে কারোর খেতে মন চাইবে। তবে খেতে অনেক টক বলে দারোগাবাড়ির কেউ খায় না। ঢেঁকি ঘরের পিছনে কিছু বিষাক্ত গাছ জন্মেছে। তাই সহজে কেউ যায় না। তবে আজকে জসিম মিয়ার ছেলে আবদুল্লাহ টক আম খেতে বায়না ধরে।

 রতনকে ডেকে আনা হলো।

“একটা চগম লাগবো। চগম দিয়ে ঢেঁকি ঘরের উপরে উঠলে পাকা গুলো পাড়া যাবে।

জসিম মিয়া,নে উঠ। মই এর অবস্হা মোটেই ভালো নয়।

অনেক কষ্টে ঢেঁকি ঘরের চালায় উঠলো রতন।আম গুলো যাচাই বাছাই করে পাকাগুলো দেখতে লাগলো রতন। জীর্ণ দেহের ঢেঁকিঘরের মরিচাধরা চালায় পা দিলে যেন চালা ভেঙ্গে নিচে পড়ে যাওয়ার শঙ্কায় অতি সর্তকতায় আম পাড়ার চেষ্টা।মই,জীর্ণদেহের ঢেঁকি চালার লগে লড়াই করে অর্ধেক বস্তা আম নিয়ে নিচে নিচে নামল।

রতন হাত পরিষ্কার করতে গেল পুকুর পাড়ের কলটাতে।এই কল নিয়ে অনেক অলৌকিক কথার প্রচলন আছে।শোনা যায় এই কলে রাতে নাকি পরির এক দল আসতো।কল থেকে পানি নিয়ে যেত।পানি নেওয়ার সময় তাদের পায়ের নুপুরের আওয়াজ শোনা যেত পুরো বাড়িজুড়ে।তাই রাতে কেউ কলে পানি নিতে আসে না।

পাশের বাড়ির সানু মিয়া একদিন রাতে বাড়ি ফিরছিল। পানি পিপাষা পাওয়ায় সেই কলটির কাছে যেতেই তীব্র আলো জ্বলজ্বল করতে দেখেছিল।সাথে নুপুরের আওয়াজ।ভয়ে সানু মিয়া পানি পান করা ছাড়াই বাড়িতের দিকে রওনা হল।

হাত ধোয়া শেষে পেছনে ফিরতে ছোট্ট আবদুল্লাহ দুইটি আম নিয়ে এসে,

নাও খাও,,,

রতন,না তুমিই খাও,,,

জসিম মিয়া,রতন কিছু আম নিয়ে যা বাড়িতে খাইস।ধর,,,

লাগবে না

আরে নিয়ে যা,

আজকে টক খেতে মন চাইছে না।

বিকেলে দারোগা বাড়ির বাগানের দক্ষিণপাশে বেশ বাতাস বইছে।উঠোন ও পুরো বাড়ি জুড়ে প্রশান্তির অনুভতি।

 

আজ বিকেলে কোনো গোল্লাছুট বা অন্য খেলায় কেউ আসে নি।সবাইকে বাগানের দক্ষিণপাশে আনন্দে মেতে  উঠেছে।সবাই নারিকেল পাতার পাখা বানিয়ে প্রতিযোগিতা করছে।দারোগা বাড়ির ছোট ছোট খেজুর গাছগুলোর আর রক্ষা নেই।সব কাটা গায়েব করে দিয়েছে ছেলেমেয়েরা।কারণ নারিকেল পাতার পাখাগুলো চালাতে খেজুর গাছের কাটা লাগে।

দারোগা বাড়ি থেকে মতিনকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল।

 মতিন মন খারাপ করে বাড়ি ফিরছে। কিছু একটা ঘটনা ঘটেছে বুঝা গেল। কিরে মতিন মন খারাপ কেন?

রতন,নিলয়ের সাথে জামেলা হয়েছে।
কি নিয়ে?


মনে আছে কিছু আগে রত্না দিদির বিয়ের জন্য সবাই পানি আনতে গিয়েছিল?
হঠাৎ তাদের কথার কথোপকথন আটকে যায় স্বার্থময় পৃথিবীর ইটের দালানে।

বুধবার, ১ জানুয়ারী, ২০২৫

সেই বুড়ো মানুষটির জন্য ।। মীনাক্ষী বুঢ়াগোঁহাই ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ বাসুদেব দাস, অনুবাদ গল্প

 সেই বুড়ো মানুষটির জন্য

 মীনাক্ষী বুঢ়াগোঁহাই

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ বাসুদেব দাস



  গড়িয়া পুকুরে বড়শি বেয়ে থাকা দিগন্তকে দাদুল দূর থেকে চিৎকার করে বলল,’ এই দিগন্ত, রত্ন মাস্টার মারা গেছে ,জানিস কি?’ ঘন্টা দুয়েক আগে এদিক দিয়ে মাস্টার মাঠের উদ্দেশ্যে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিল নাকি? তখন দিগন্ত বড়শির সাজসরঞ্জাম তৈরি করতে ব্যস্ত ছিল। কীভাবে মানুষটার মৃত্যু হল বলে জিজ্ঞেস করবে ভাবতে ভাবতেই দাদুল অনেক দূরে চলে গেল।ফোর জিরো সেভেন বুড়োকে ধাক্কা মেরেছে নাকি ?

 তাড়াতাড়ি করে দিগন্ত বড়শি গুছিয়ে রাখতে লাগল। সে যখন রত্নমাস্টারের বাড়ির কাছে গিয়ে পৌঁছাল , তখন জায়গাটা মানুষে ভরে পড়েছে। মাস্টারের ঘরের দরজার সামনে, ভেতরে বাইরে কেবল মানুষই মানুষ ।এতগুলি মানুষ এত তাড়াতাড়ি কীভাবে জানতে পারল যে রত্ন মাস্টারের মৃত্যু হয়েছে ।শোবার ঘর থেকে হাজরিকা ডাক্তার চোখের জল মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসছে। পেছন পেছন মাথা নিচু করে শইকীয়া কম্পাউন্ডার।ডাক্তারও কাঁদে? দিগন্তের মনে মনে হাসি পেয়ে গেল। রত্নমাস্টারের বড়ো ছেলে এবং হাজরিকা ডাক্তার স্কুলে একসঙ্গে পড়াশোনা করা, সেই জন্যই মানুষকে দেখিয়ে কাঁদছে বোধ হয়।

 কী হয়ে মানুষটার মৃত্যু হল জিজ্ঞেস করবে বলে ভেবেও সে জিজ্ঞেস করার মতো আশেপাশে কাউকে দেখতে পেল না। প্রত্যেকেই ভদ্র ঘরের মানুষ। দুই একজন অপরিচিত মানুষও রয়েছে। তখনই দূরে শৈলেনকে দেখতে পেয়ে সে কাছে এগিয়ে গেল। শৈলেনের হাতে চিমটি কেটে সে জিজ্ঞেস করল,’ কী হয়েছিল রে? আমি ভালো করে জানি না বুঝেছিস।’ হার্ট ফেল’ করেছে বলে শুনেছি।’

 ‘ হার্টফেল ?অন্তরে কোনো আঘাত পেলে তবে হে হার্টফেল করবে ।দিগন্ত শৈলেন কে বুঝানোর চেষ্টা করল। শৈলেন কী জানি বলে অন্য মানুষের ভিড়ের দিকে এগিয়ে গেল। দিগন্ত এদিকে ওদিকে ঘুরে বেড়াতে লাগল।রত্নমাস্টারের স্ত্রী হাউ মাউ করে চিৎকার করতে থাকবে বলে সে ভেবেছিল। কিন্তু ভেতর থেকে কারও কান্না ভেসে আসছে না। কোনো ধরনের কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছে না, কেবল গহীন গম্ভীর মানুষগুলি জমায়েত হয়ে রয়েছে। ধুর এটা কি মরা মানুষের ঘর? শৈলেনের কাছে গেল।’ দিদি বাড়িতে নেই নাকি? সে শৈলেনকে জিজ্ঞেস করল।

 রত্নমাস্টারের স্ত্রী এই অঞ্চলের প্রত্যেকেরই দিদি।উনিশশো একান্ন না বাহান্ন সনে তিনি এই অঞ্চলে মেট্রিক পাশ করা প্রথম মেয়ে। সেই তখন থেকে ছেলে বুড়ো প্রত্যেকেরই তিনি দিদি এবং এখন তার নাতি নাতনির বয়সের ছেলেমেয়েরাও তাকে দিদি বলেই ডাকে। নিজের সম্পর্কের মানুষগুলি ছাড়া অন্যেরা যদি তাকে কাকিমা মাসি বলে সম্বোধন করে, তখন তিনি খুব একটা খুশি হন না। বিশেষ করে কেউ যদি তাকে বড়োমা বা মাসি বলে ডাকে তাকে নির্ঘাত গালি খেতে হবে।—মাসি বলে ডাকা ছেলেটিকে বলবে—’ এই আমি তোর মায়ের দিদি নাকি? তোর মায়ের আগে জন্ম হয়েছিল না আমার আগে হয়েছিল— তুই দেখেছিলি নাকি পুনরায় বড়মা ডাকা ছেলেটিকে বলবে আমাদের মাস্টারকে বুড়ো পেয়েছিস নাকি যে আমি তোর বড়োমা হব। কেউ বুড়ি বলে মন্তব্য করলে তো তার অবস্থা শেষ ।

 দিগন্ত যদিও তার নাতি তথাপি মানুষটার স্বভাবটা জানে বলে সে শৈলেনের সামনে দিদি নাই নাকি বলে জিজ্ঞেস করল । শৈলেন বলল না দিদি গতকাল অরুণা দিদির বাড়িতে গিয়েছে। অরুণা দিদি মানে রত্নমাস্টারের বড়ো মেয়ে, কোনো একটি কলেজের অধ্যাপিকা— অঞ্চলের প্রথম এমএ,তাই তিনি সকলেরই দিদি। দিগন্ত এবার আশ্বস্ত হল।

 রত্নমাস্টার এবং দিদি ছাড়া এই প্রকাণ্ড বাড়িটাতে এখন কেউ থাকে না। তারা দুজনের মধ্যে একজন একজন করে কোথাও মানে ছেলেমেয়ের বাড়িতে গিয়ে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই রত্নমাস্টারের আকস্মিক মৃত্যুর জন্য আশেপাশের প্রত্যেকেই বিমূঢ় হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে তার ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীরা। তাকেই প্রত্যেকে এটা কর,ওটা কর বলে চলেছে। কেউ বলছে— কাউকে পাঠিয়ে দে,কেউ বলছে ওয়ারলেস মেসেজ কর, আবার কেউ বলছে ছেলেদের ফোন নাম্বার খুঁজে দেখ, মারা গেছে বলে দে।তার মধ্যে আবার কেউ বলছে বড়ো ছেলেকে খবর দিলেই হবে— তার কাছ থেকেই বাকি সবাই জানতে পারবে ।মোটকথা চারপাশে মৃদু গুঞ্জন, চাপা উত্তেজনা।

 রত্নমাস্টারের সম্পর্কীয় ভাই চন্দ্রের চোখ হঠাৎ দিগন্তের উপরে পড়ল। ও, তুইও এসেছিস। অন্যেরা কেউ না এলে মুখাগ্নি করার দায়িত্বটা তুই পাবি, থাক থাক।’ বলে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। দিগন্তের শরীরটার মধ্যে যেন বিছা লেগেছে। সে সেখান থেকে চলে আসবে বলে ভাবল, কিন্তু এতগুলি মানুষের আকর্ষণ তাকে বেঁধে রাখল।

  এই বাড়ির ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারী দিগন্তই হত। আজ এতগুলি মানুষের মধ্যে রত্নমাস্টারের একমাত্র আত্মীয় সেই। কিন্তু সেই আত্মীয়তা সমাজ স্বীকৃত নয়,, যার জন্য দিগন্তও এই মানুষগুলির সঙ্গে সাধারণ হয়ে রত্নমাস্টারের মৃতদেহটা ঘিরে আছে।

রত্ন মাস্টার মানুষের সামনে বলেছিল,’ সেই মেয়েটি বললেই হবে দিগন্ত আমার নাতি সে যে আমার নাতি তার লক্ষণ কিছু আপনারা দেখেছেন কি? তার চেহারাতেই রয়েছে নাকি তার বুদ্ধিবৃত্তিতে রয়েছে? আমার ছেলে মেয়েদের কেউ কোথাও সেকেণ্ড ডিভিসন পেয়েছে কি? সেই দিগন্ত নামে ছেলেটি –ক্লাস সেভেনে যে তিনবার ফেইল করেছে সে আমার নাতি হতে পারে কি?’রত্নমাস্টারকে সবসময় ঘিরে থাকা তাঁর গুণমুগ্ধরা তাঁর অন্য কথাতেও যেমন সায় দেয় সেভাবে এই কথাতেও সায় দিয়েছিল।

 কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য বা নেতা না হয়েও এই অঞ্চলে রত্নমাস্টারের প্রতিপত্তি অসীম। জীবনের মধ্যভাগ পর্যন্ত তিনি অবশ্য এত প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন না। একটি সামান্য হাইস্কুল খুলে তেমনই সমাজসেবা এবং জীবনসংগ্রাম আরম্ভ করেছিলেন। প্রচুর অভিজ্ঞতা এবং কঠোর শ্রমে তিনি স্কুলটা উজ্জীবিত করে তোলার সঙ্গে অঞ্চলটির উন্নয়নশীল কাজকর্মে এভাবে জড়িত হয়ে পড়লেন যে তাকে বাদ দিয়ে সেই অঞ্চলের জনগণ অন্য মানুষের কথা ভাবতেই পারে না।

 সেই প্রতিষ্ঠিত ,প্রতিপত্তিশীল রত্নমাস্টারের বড়োছেলের সঙ্গে বদনাম হল তরুলতা নামের সাধারণ ঘরের সাধারণ একটি মেয়ের। মাস্টারের ছেলেটি তখন ইঞ্জিনিয়ারিঙের প্রথম সেমিস্টারে। কিন্তু সে সেই সময়ে কোনোমতেই স্বীকার করল না যে তরুলতার গর্ভের সন্তানটির সেই পিতা। সে মাত্র বলেছিল যে ইঞ্জিনিয়ারিঙের টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে আসার পরে সে তরুর সঙ্গে কথাবার্তা বলেছিল এবং ওদের একসঙ্গে থাকতে অন্য মানুষেরাও দেখেছিল। কিন্তু এই ধরনের সাংঘাতিক কিছু একটা ? না, না –মোটকথা জয়ন্ত জনসভায় না থেকে হ্যাঁ করল না।সেদিন তরুলতা কেবল চোখের জল ফেলতে ফেলতে তার দিকে একবার অঙ্গুলি নির্দেশ করল। তারপর থেকে সে সেই যে নিশ্চুপ হয়ে পড়ল এখনও সেই নিশ্চুপই রয়েছে।

 বর্তমানে তার সমস্ত কাজকর্ম ,চিন্তাধারা দিগন্তকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়ে চলেছে। ইতিমধ্যে জয়ন্ত ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে ,ঘর-সংসার করে বৈধ পিতৃ্ত্বের অধিকারীও হয়েছে ।

 আর দিগন্ত রত্নমাস্টারকে অস্বস্তিতে ফেলে দিগন্ত নামের ছোটোখাটো গাধা ছেলেটি মাস্টারের জীবনবৃত্তের চারপাশে ঘুরতে থাকল।

 দিগন্তের জীবনের এই সতেরোটা বছর কেবল রত্নমাস্টার নামে মানুষটার কথা ভাবতেই পার হয়ে গেল। আশ্চর্যের কথা । তার ক্ষুদ্র জীবনের সুখ-দুঃখ,হাসি-কান্নার কথা সে রত্নমাস্টারকে বোঝাতে চায়,দেখাতে চায় । সারাদিনে একবার রত্নমাস্টারকে না দেখলে তার ভালো লাগে না। এমন কী নতুন কাপড় পরলেও সে রত্নমাস্টারের চোখের সামনে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসে। তার জীবনের সবচেয়ে ইম্পরটেন্ট ব্যক্তিটিই হলেন রত্নমাস্টার। সে মাস্টারের চোখের সামনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে দেখাতে চাইছিল। কিন্তু হঠাৎ রত্নমাস্টারের মৃত্যু ঘটায় সবকিছুই কেমন যেন উলোট পালট হয়ে গেল।

 দিগন্ত মাঝে মধ্যে একা কথা বলে। অন্যের চোখে একা একা কথা বলা মনে হলেও আসলে দিগন্ত কল্পনায় রত্নমাস্টারের সঙ্গে কথা বলে। তার অজান্তে সে রত্নমাস্টারকে বলতে চাওয়া কথাগুলি তার মুখ দিয়ে শব্দ করে বেরিয়ে যায়। তরুলতা এই মুহূর্তগুলিতে তাকে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কী আছে রত্নমাস্টারের শরীরে? দিগন্ত যে সেই মানুষটাকে এত গুরুত্ব দেয়। অথচ সে যে মানুষটাকে ভালোবাসে তা তো নয়। দিগন্তের বন্ধুরা দিগন্তের একমাত্র শত্রু বলতে রত্নমাস্টারকে বোঝে।

 আসলে মানুষের জীবনে শত্রু বলে ভাবা ব্যক্তিটিই বোধহয় জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।মানুষ শত্রুর চোখের সামনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে শত্রুর অন্তরে জ্বলনের সৃষ্টি করতে চায়। সেই শত্রুর মৃত্যুর পরে কাকে দেখাবে নিজের ঐশ্বর্য ,সুখ-শান্তি ?প্রেমিকা এবং শত্রুর মধ্যে পার্থক্য কি?ঘুম থেকে জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কার কথা ভাবা হয় ? শত্রুর না প্রিয়জনের?দুটিই দেখছি একাকার হয়ে যায়। রত্নমাস্টারের মৃত্যুতে দিগন্ত যেন হঠাৎ নিঃস্ব হইয়ে পড়ল।

 দিগন্ত বাড়ি এল।মাকে খবরটা দেওয়ার পরে মা তার চোখের দিকে একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপরে স্বাভাবিক ভাবেই নিজের অর্ধ সমাপ্ত ঘরোয়া কাজগুলি করতে লাগল।

 দিগন্ত নিজের চারপাশটা ভালোভাবে দেখে নিয়ে ভাবল, এই সুন্দর পৃ্থিবীটা রত্ন মাস্টারের চোখের সামনে থেকে সরে গেল। সেও ইঞ্জিনিয়ার হবে বলে ভেবেছিল।তার পিতা জয়ন্তের মতো।সে কল্পনা করেছিল,ইঞ্জিনিয়ার হয়ে রত্নমাস্টারের দীর্ঘ পদূলিতে সে গাড়ি থেকে নামবে।দুই হাতে কোট-টাই ঠিক করে বারান্দায় বসে থাকা রত্নমাস্টারের কাছে গিয়ে বুক ফুলিয়ে বলবে, ‘আমি ইঞ্জিনিয়ার হলাম।’

 শেষ রাতে রত্নমাস্টারের পত্নী বড়ো ছেলে জয়ন্ত এবং মেয়ে অরুণা এসে উপস্থিত হল। বাড়িতে তখন কান্নার রোল উঠল। দিগন্তদের বাড়ি থেকেও কান্নার রোল ভেসে আসতে লাগল ।সকালবেলা মৃতদহ নিয়ে খোল বাজিয়ে শবযাত্রা আরম্ভ হল। দিগন্ত বাড়ির ভেতরেই থাকবে বলে ভেবেছিল যদিও এক দুর্বার আকর্ষণ পুনরায় তাকে রত্নমাস্টারের মৃতদেহের কাছে নিয়ে গেল।

 সেদিনই একটার সময় শব দাহ করা হল। চিতার আশেপাশে তখনও পুরুষ মহিলারা জায়গাটা পরিপূর্ণ করে রেখেছিল। বেশিরভাগ মানুষ যে যার বাড়িতে চলে যাবার পরে দিগন্তও বাড়ি ফিরে এল। মা তাকে স্নান করার জন্য জল- গামছা এগিয়ে দিল। স্নান করে এসে অন্যান্য দিনের মতোই সে মাকে বলল, ‘মা খুব ক্ষুধা পেয়েছে। তাড়াতাড়ি ভাত দে।’ মা তার হাত ধরে বাড়ির পেছনদিকে বাগানের কাছে টেনে নিয়ে গেল। মা তাকে আস্তে করে বলল—‘তোকে আজ ভাত খেতে হবে না। তুই আজ এক বেলা উপোস করবি।’

  দিগন্ত যেন ক্রোধে ফেটে পড়বে। যে বাড়ি তাকে আজ পর্যন্ত স্বীকৃতি দান করেনি, যে মানুষটা রাস্তাঘাটে দেখলেই তাকে উপহাস ছাড়া আর কোনভাবেই সম্ভাষণ জানাতো না–সেই মানুষটার মৃত্যুতে দিগন্তকে একবেলা উপোস করতে হবে। ‘কেন উপোস করব’বলতে না বলতেই মা ফিসফিস করে তাকে বলতে লাগল—‘আমার শপথ দিগন্ত, তুই অন্য কারও কাছে বলবি না। আসলে রত্ন মাস্টারই তোর পিতা।পিতার বয়সের একজন মানুষকে বদনাম করতে ইচ্ছা হল না বলেই আমি জয়ন্তই তোর পিতা বলে বলছিলাম।পিতার মৃত্যুতে তুই … ।

 দিগন্তের পায়ের পাতা থেকে উপর পর্যন্ত ঝিনঝিন করতে লাগল। মা তার পরের কথাগুলি কী বলছে তার কানে প্রবেশ করল না। সে মায়ের মুখের দিকে কখনও না তাকানো অদ্ভুত মুখাকৃতির একজন মানুষকে দেখার মতো অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

------------

 লেখক পরিচিতি-মেঘালয়ের তুরা গভর্ণমেন্ট কলেজের অসমিয়া বিভাগের প্রধান অধ্যাপিকা।প্রকাশিত গ্রন্থ –হাতি খুতরার সপোন,অনুবাদ-লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার,বিভিন্ন পত্র পত্রিকার লেখিকা।একজন প্রতিশ্রুতি সম্পন্ন লেখিকা।


বুধবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৪

একগুচ্ছ অনুবাদ কবিতা ।। নীলিম কুমার মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস, Nilim Kumar


একগুচ্ছ অনুবাদ কবিতা ।। নীলিম কুমার

 মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস 



কবি পরিচিতি--সাম্প্রতিক অসমের অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং বিতর্কিত কবি নীলিম কুমার ১৯৬১ সালে অসমের পাঠশালায় জন্মগ্রহণ করেন। পেশায় চিকিৎসক। প্রকাশিত গ্রন্থ ‘ অচিনার অসুখ’,’ স্বপ্নর রেলগাড়ি’,’ জোনাক ভাল পোয়া তিরোতাজনী’, নীলিম কুমারের শ্রেষ্ঠ কবিতা‘ ইত্যাদি। প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ২৪।




কবিতা ।। মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ– বাসুদেব দাস

 


অতিথি


মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ -বাসুদেব দাস

কিছুই জিজ্ঞেস না করে আমার বুকের দরজা খুলে সে

ভেতরে প্রবেশ করল

এসেই আমার প্রেমের ফুলদানিটা

ভেঙ্গে ফেলল

কোথাকার আপদ একটা

সকালেই চলে এসেছিল

খাওয়ালাম

দাওয়ালাম

বিকেল হল

অতিথি তো যায় না

রাত হল

অতিথি আমার বিছানায় গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ল

মধ্যরাতে আমার হাতে বুক থেকে একটা পুঁটলি বের করে দিয়ে

হঠাৎ সে যাবার জন্য প্রস্তুত হল

রাতের রেলে যাবে

পুঁটলিটা খুলে দেখে

দেখলাম আমার প্রেমের ফুলদানিটার মতো

ভেঙ্গে আছে তাঁর হৃদয়

কোথাকার অতিথি এসেছিল

রাতের রেলে সে কোথয় বা চলে গেল

 

 

নিরুদ্দেশের বিজ্ঞপ্তি


মানুষগুলি হারিয়ে যাচ্ছে।

তাই আজকাল মানুষগুলি ফোটো উঠে বেশি।

নিরুদ্দেশের বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জুনুন নিজেই ফোটোগুলিতে

খুঁজে বেড়ায় নিজেকে। আমরা ফোটোগুলিতে

খুঁজে বেড়াই নিজেরই মুখটি এবং দেখতে পাই

অবিকল নিজের অপরিচিত মুখটা।

নিজের সেই অপরিচিত মুখটিকে আমি

ভালোবাসতে বাধ্য করাই নিজেকে।

না হলে আমার উপায় থাকেনা।

কারণ আমরা হারিয়েছি

আজকালকার ফোটোগুলিতে আমাদের সঙ্গে থাকে—

প্রিয়, অপ্রিয়, অর্ধপ্রিয়, অর্ধ শত্রু, অর্ধ মিত্র

বিশ্বাসী অবিশ্বাসী ভবিষ্যতের শত্রু হতে চলা প্রত্যেকেই।

—এই সবার মধ্যে নিজেকে দেখে করুনা জন্মায়।

কেননা সেই জন নিজের ভবিষ্যতের বিষয়ে

কোন আন্দাজ করতে পারেনা যে সেই জন হারিয়েছে।

 

যত ফোটো উঠেছে মানুষগুলি, ততই নিজেকে হারিয়েছে।

 

  

বাতাস এবং নারী


মূল অসমিয়া  বাংলা অনুবাদ‐ বাসুদেব দাস

প্রচন্ড গরম।

গোধূলি হয়েছিল কেবল,

হঠাৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ চলে গেল।

দেখা গেল

আটমহলের বাড়িটির ছাদে

একজন মহিলা উঠে আসছে,

হাতে একটা পাখা!

আর কিছু ভাবতে ভাবতে

নিজেকে হাওয়া করতে থাকল

 

কিছুক্ষণ পরে

তাঁর ভাবনা

তাঁর হাতের মুঠি থেকে

পাখাটা নিচে ফেলে দিল

ঠিক এই মুহূর্ত পর্যন্ত

পথ চেয়েছিল বাতাস

বাতাস দৌড়ে এল

একটু অভিমান নিয়ে,

আর মহিলাটিকে বলল না যে

উদাস ভাবনাগুলি অপকারী।

কারণ বাতাস ভালোভাবেই জানে‐

নারী অবিহনে ভাবনাগুলি বেঁচে থাকে না

বাতাস মহিলাটির চুলগুলি

উড়াতে লাগল,

আর শাড়ির আঁচলটাও!

 

বাতাসের প্রতি কৃতজ্ঞতায়

মহিলাটির মুখে হাসি ফুটে উঠল

বাতাস বহুদিন দেখেনি

এরকম হাসি





এই শহরের সবচেয়ে

বুড়ো মানুষটি

প্রতিদিন বারান্দায় বসে অপেক্ষা করে থাকে খবরের কাগজটির জন্য

 

তার খবরের কাগজটি না পড়া পর্যন্ত যেন এই শহরে

সকালগুলি আসতেই পারে না।

 

খবরের কাগজটি  না পড়া পর্যন্ত

তাঁর গলা সকালের

এক কাপ চা ও গিলে না।

 

তাঁর পত্নী চায়ের কাপ নিয়ে

ঠিক তখনই উপস্থিত হয়

যখন তাঁর চোখ পড়তে শুরু করে

প্রথম পৃষ্ঠার শিরোনামগুলি

 

চায়ের কাপের সঙ্গে তিনি খবরের কাগজটি পড়ে শেষ করে

 

তারপরে তিনি

স্নান করতে যান

এবং

খবরের কাগজের সমস্ত অক্ষরগুলি ধুয়ে ফেলেন

 

তিনি খাওয়া চায়ের কাপটা ধুয়ে ফেলেন তাঁর

পত্নী।


প্রদীপ

 

জ্বলছিস হয়তো তুই 

পোড়ানোর জন্য আমার  বুকের  অন্ধকার?

তোর অর্ধেক জীবন গেল

 

একটুও অন্ধকার দূর হল না

জ্বলে জ্বলে এখন দেখছি

তুই শেষ হবি

নিজে  দেখছি ডুবে যাবি অন্ধকারে

 

কেবল ঈশ্বরই তোর খোঁজে আসবে

তিনি তো খুঁজে পাবেন না

এত অন্ধকারে তোর আত্মা

তোর খোঁজে পুনরায়

তোকেই জ্বালাবে ঈশ্বরও

ওহে অবোধ প্রদীপ

অন্ধকারও   দুঃখী

তোকে দেখে

কীভাবে বলি শুভ দীপাবলী???


 


শনিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৪

পাখিদের পাড়া পড়শী- ৩// ১১ পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস, Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider Para Porshi তৃতীয় অধ্যায়, একাদশ অংশ

 পাখিদের পাড়া পড়শী- ৩// ১১


পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি   


মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস,  

Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider Para Porshi

তৃতীয় অধ্যায়, একাদশ অংশ 



(১১)

 আজ রাস পূর্ণিমা।

 সকাল থেকে প্রতিটি কর্মীই ব্যস্ত। আজ আমাদের স্বপ্নের পর্যটক নিবাসটি বাস্তব রূপ লাভ করবে। গত তিন চার দিন ধরে আমাদের ব্যস্ততার আর শেষ নেই। নবজিৎ বৈশ্য, কীচক ,টিংকু, জেপি প্রত্যেকেই চাকরি থেকে তিন দিনের জন্য ছুটি নিয়েছে। পর্যটক নিবাসীর চারপাশে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। প্রতিটি পরিবেশ কর্মী নিজের নিজের দায়িত্বে কাজ সুন্দরভাবে সম্পন্ন করে চলেছে। আমি স্থায়ীভাবে কাজ করা প্রত্যেককেই নতুন কাপড় উপহার দিয়েছি। সৌম্যদা পাঠানো জনজাতীয় মানুষ দুটিকে, নব কাজ করার জন্য নিযুক্ত করা দুজন ব্যক্তিকে এবং নৈমিত্তিক কাজ করা অন্য চারজন ব্যক্তিকে। আজকের অনুষ্ঠানে তারা নতুন কাপড় পরে এসেছে। অনামিকা, জ্যোতিমালা, কাকিমা প্রত্যেকেই সুন্দর পরিষ্কার পোশাক পরে পরিচ্ছন্ন হয়ে সকাল থেকে পরিবেশটাকে সুন্দর করে তুলেছে। অচ্যুত পরিচালনার সমস্ত দিক সামলাচ্ছে। অতীতকে পুলক এবং রাতুল সাহায্য করছে। পুলকের বন্ধু এপেটাইজারের মালিক পাঠানো রাঁধুনী দুইজন আরও দক্ষ। ওরা দুজনেই নিষ্ঠাবান প্রকৃতি কর্মীর মতোই পরিবেশ পটু। কোথাও এক ফোঁটা নোংরা দেখতে পেলে কোনো একজন নয়, অন্যের কাঁধে থাকা গামছা দিয়ে হলেও মুছে দিচ্ছে। জানিনা,এই পটুতা কতদিন অব্যাহত থাকবে।

 অচ্যুত পুলক এবং রাতুল কফি রঙের জামা এবং কালো রঙের প্যান্ট পরেছে। শার্টের আস্তিনে লাগানো আছে কালো রঙের পটি।বাকি তিনজন ছেলে এবং দুটি মেয়ে ঘরের ভেতরে থাকা পর্যটকদের শুশ্রূষা করবে। ওদের পোশাকের রং নীল। কাপড়ের নির্বাচন অচ্যুত পুলকদের।সব বিষয়ে আমি হস্তক্ষেপ করতে চাইনি। দেখি না ওরা কাজটাকে কীভাবে সামলে নেয়। তবে আমি লক্ষ্য করলাম, ওদেরকে দু-চারটি কথা বলার প্রয়োজন আছে।

 গতরাতে আমরা প্রত্যেকেই পর্যটক নিবাসের কাজ শেষ হওয়া উপলক্ষে এক ভোজ সভায় মিলিত হয়েছিলাম। নতুন করে নিযুক্ত হওয়া রাঁধুনি ভরত এবং নরেন আমাদের আপ্যায়িত করেছিল। আমি সবার উদ্দেশ্যে বলেছিলাম তোমাদের স্থানীয় খাদ্য সম্ভারের উপরে গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের এখানে আসা পর্যটক বিদেশি খাদ্য সম্ভারের স্বাদ নিতে আসে না, আসে স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিতে। সকালের আহারে পুরী দেবার চেয়ে কোমল চাল এবং দই দিয়ে আপ্যায়ন করার চেষ্টা করবে। সঙ্গে নারকেলের নাড়ু। চায়ের সঙ্গে কলা পাতায় করে পিঠা। কুলি পিঠার ভেতরে চিনি নারকেলের গুড়ি দিলে আমি তোমাদের সামনে লাউসের অভিজ্ঞতার কথা বললাম। অচ্যুতকে বললাম তুমি আমাদের স্থানীয় খাদ্য সম্ভারের তালিকা প্রস্তুত করবে এবং প্রতিটি গ্রাহকের সামনে সেটাই দেবে। কাসার থালা এবং বাটি দেখেছ, তারমধ্যে পুরী পরিবেশন করলে কেমন দেখাবে । জল খাবার জন্য পেতলের গ্লাস এবং ছোটো ছোটো ঘটি ব্যবহার করলে আমাদের আভিজাত্য কমবে না, বরং বাড়বে। স্থানীয় খাদ্য পরিবেশন এবং একান্তই আমরা ব্যবহার করা সাজ সরঞ্জাম আমাদেরকে পুরোনো কালের বলবেনা , নিজের পরিচয় দিতে কুণ্ঠা বোধ না করা জাতীয়তাবাদী হিসেবে পরিচয় দিতে হবে। খাদ্য পরিবেশনের সময় ছেলেদের আটহাতি ধুতি এবং জামা ব্যবহার করতে বলবে এবং তাদের জন্য সেরকম কাপড়ের ব্যবস্থা করবে।

 পর্যটক নিবাসে কাজ করা প্রতিটি কর্মীকেই মনে রাখতে হবে তারা প্রকৃতি কর্মী, তারা পর্যটন কর্মী ।তাদের প্রত্যেকেরই থাকতে হবে কর্ম তৎপরতা এবং সেবার মনোভাব ।কেউ যদি না পারে সে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নেবে অথবা তাকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।

  মনে রাখবে তোমরা এক এক জন ব্যবসায়ী ।তোমাদের কর্ম পদ্ধতি ব্যবসার অনিষ্ট করলে তোমাদের নিজেদেরই তার ফল ভোগ করতে হবে।

 সফল ব্যবসায়ী বিপিন ডেকার উপরে আমার ভরসা আছে। তিনি পর্যটক নিবাসের প্রকল্পটিকে অন্তর থেকে গ্রহণ করেছেন। তারা প্রত্যেকেই পরিচালনার দিকটি দেখবে, কিন্তু পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে ‌।বিজ্ঞাপন দিলে সাধারণ পর্যটক ভিড় করলে পরিবেশের উপরে বিরূপ প্রভাব পড়বে। অবশ্য সমস্ত পর্যটককে দশ মিনিটের জন্য প্রকৃতি পর্যটনের উপরে সাধারণ প্রশিক্ষণ একটা দেওয়া যেতে পারে। সঙ্গে তাদের হাতে একটা ছোটো পুস্তিকাও তুলে দেওয়া যেতে পারে, যেখানে প্রকৃতি পর্যটনের উপরে সম্যক আভাস উল্লেখ থাকবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কথা কাজগুলি এগিয়ে যাবে। অভিজ্ঞতা এবং অনুশীলন আমাদের অনেক কথা শেখাবে। সৌম্যদা এবং শৈলেশ চৌধুরী ভরসার যোগ্য। তারা প্রতিমুহূর্তে আমাদের সঙ্গে আছে। তাদের উপরে দায়িত্ব দিলে আমাদের নিবাসে পর্যটকের কোনো অভাব হবে না।

  উৎসবমুখর দিনটিতে আমি ঋণাত্মক দিকসমূহের উপরে আলোকপাত করতে চাইনি।সৌম্যদা পৃথক পৃথকভাবে প্রকৃতি কর্মীদের নিজের অভিজ্ঞতা থেকে যথাসম্ভব শলা পরামর্শ দিচ্ছে।কোথায় কী তৈরি করলে দেখতে ভালো লাগবে– বিপিন ডেকা ও দেখিয়ে গেছে। আমি জানি এইসব এই মুহূর্তের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয়। তথাপি প্রতিজন প্রকৃতি কর্মীর নিজস্ব ইচ্ছা অভিলাস আছে। তাতে বাধা দেওয়ার কোনো প্রয়োজন আমরা কেউ অনুভব করছি না।

   বিপিন ডেকা প্রতিটি টেপে জল ভালো করে বইছে কিনা পরীক্ষা করার জন্য জলের টেপগুলি খুলে দেখছে। জিজ্ঞাসা করছে জলাধারে পর্যাপ্ত জল উঠিয়ে রাখা হয়েছে কিনা। জেপি প্রতিটি পর্যটক নিবাসী দরজার সামনে ধুপ কাঠি জ্বালিয়ে দিয়েছে। সুনন্দ পড়ে থাকা কলাপাতার টুকরো একটা উঠিয়ে নিয়ে পাশের নোংরা ফেলার জায়গায় ফেলে দিয়েছে। রাতুল পাইপ দিয়ে চারপাশে জল ছিটাচ্ছে।নবজিৎ সন্ধ্যার কার্যসূচী সফল করার জন্য ব্যস্ত। সে অভিনেতা মৃদুল ভুইয়া এবং অভিনেত্রী প্রস্তুতি পরাশরের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করায় ব্যস্ত। তারা দুজনেই সময় মত না এলে অসুবিধা হবে। তারা দুজনেই নবজিতকে আশ্বাস দিয়েছে তারা নির্দিষ্ট সময়ের দশ মিনিট আগেই পৌঁছে যাবে।দুজনকেই মনে করিয়ে দিয়েছে শরাইঘাটে প্রতিদিন যানজট হয়। সঙ্গে এটাও বলেছে নলবাড়ির হরি মন্দিরের রাস মহোৎসব উদ্বোধন করার সময় পর্যটক নিবাসের দ্বার উন্মোচন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।নবজিতের মতে তার মধ্যে কোনো ধর্মীয় কারণ নেই,হরি মন্দিরের মাধ্যমে প্রচলিত হওয়ার জন্য সামাজিক পরম্পরা রক্ষা করাই একমাত্র কারণ। তারা দুজনেই নবজিতকে উল্টে অনুরোধ জানিয়েছে তোমরা সময়ে শুরু করবে। তোমাদের ওখান থেকে গিয়ে আমাদের প্রথম দর্শনীর জন্য প্রস্তুত হতে হবে।যেতে হবে টিহুতে। নবজিৎ নির্দিষ্ট সময় পাঁচটা দশ মিনিটে আরম্ভ হবে বলে পূর্ণ আশ্বাস দিয়ে তাদের আমন্ত্রণ নিশ্চিত হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি অনুভব করেছে।

  প্রকৃতি কর্মী অধর এবং শ্বাহ আলম কাছের অগ্নিশালা গ্রামে গিয়ে আতশবাজি কিনে এনেছে। অগ্নিশালা গ্রামে ব্রিটিশ শাসন কাল থেকেই পরম্পরাগত ভাবে উন্নত মানদন্ডের আতশবাজি নির্মাণ করে। দুই প্রকৃতি কর্মী আতশবাজি কিনে এনেছে বলে জানতে পেরে সৌম্যদা দুজনকেই ডেকে আনল। সৌম্যদা দুজনকেই তোমরা আতশবাজি এনেছ নাকি বলে জিজ্ঞেস করায় দুজনেই এনেছে বলে জানাল। তখন সৌম্যদা বললেন— তোমরা জান না,তাই তোমাদের ভুল হয়েছে বলতে পারিনা। তোমরা জেনে রাখ আতশবাজি প্রকৃতির ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। এতে ব্যবহার করা রাসায়নিক পদার্থ পরিবেশ দূষিত করে।। আতশবাজির উজ্জ্বল আলো এবং শব্দ বন্যপ্রাণীদের আতঙ্কিত ভীতিগ্রস্ত করে তুলে। তোমরা কল্পনা কর তো এখানে জ্বালানো আতশবাজি কত আলো এবং শব্দের সৃষ্টি করবে। আশেপাশের অরণ্যে থাকা জীবজন্তুগুলি সেই আলো দেখতে পাবে। এবং শব্দ শুনতে পাবে। ওরা তখন ভয়ে এখান থেকে দূরে চলে যাবে। প্রকৃতি কর্মী হিসেবে তোমরা নিশ্চয়ই এরকম ভুল করবে না।

অধর এবং শ্বাহ আলমের মনে সৌম্যদার মন্তব্য গভীর প্রভাব বিস্তার করল।ওরা দুজন আতশবাজি এনেছে বলে জানতে পেরে যে কয়েকজন তরুণ প্রকৃতিকর্মী আনন্দ পেয়েছিল তাদের অধর এবং শ্বাহ আলম ফটকা এবং আতশবাজির অপকারিতার বিষয়ে সৌম্যদা বলা কথাগুলি জানানোয় ওরা জিজ্ঞেস করল তাহলে এখন কী হবে ? তখন অধর এবং শ্বাহ আলম বলল, আজকের কথা তো আলাদা, জীবনে আর কখনও ফটকা আতশবাজি জ্বালানো হবে না।অন্যেরা জ্বালাতে চাইলে তাদের বাধা দেব।

 পর্যটক নিবাসকে কেন্দ্র করে ঘটতে থাকা বিভিন্ন কার্যাবলী চেতন অথবা অবচেতনভাবে আমার চোখের সামনে পার হয়ে যাচ্ছে। আগামীকাল থেকে আমি অতি সন্তর্পনে পর্যটক নিবাসের বিভিন্ন কার্যাবলী থেকে সরে আসছি। যে গাছের নিচে চেয়ার পেতে আমরা পর্যটক নিবাস নির্মাণের সম্পূর্ণ কার্যাবলী প্রত্যক্ষ করেছিলাম, সেখানে এখন সুন্দর ফুলের বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। লাল রংয়ের নার্জি ফুলের গাছগুলি দ্রুত বেড়ে চলেছে এবং দুই একটি ফুলের কলি প্রস্ফুটিত হয়েছে ।আমি বাগানের কাছে এটা চেয়ার পেতে বসে একা প্রকৃতি কর্মীদের কাজকর্ম গুলি নিরীক্ষণ করছি। সবাই নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত। দিনের বেলা স্থানীয় এয়োরা নাম প্রসঙ্গ করার কথা। সুনন্দের মা এবং কাকিমা নাম প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়েছে। তাদের দলটি প্রয়োজনীয় বাদ্যযন্ত্র হাতে নিয়ে ইতিমধ্যে এসে উপস্থিত হয়েছে। দলটি হলঘরের ভেতরে প্রসঙ্গের বিধিব্যবস্থা করছে। তাদের চা জল খাবার দেবার জন্য অনামিকা জ্যোতি মালা জুলিয়েট ব্যস্ত। ভরত এবং নরেন ব্যস্ত নাম প্রসঙ্গে অন্তত আয়োতি এবং উপস্থিত লোকের জন্য খিচুড়ি প্রস্তুত করায়। সৌম্যদা একদল ছেলেমেয়ে নিয়ে গ্রামের প্রতি ঘর মানুষের বাগান বস্তিতে রোপণ করা গাছের চারাগুলি কীভাবে যত্ন নিচ্ছে দেখতে গিয়েছেন। কেউ প্রয়োজন অনুসারে যদি গাছের চারায় বেড়া দিয়ে ঘেরাও করেনি,তাদের সাহায্য করার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সঙ্গে নিয়ে গেছে।আগাছা উৎপাদিত করার জন্য খুন্তি খুরপি সঙ্গে নিয়েছে। সৌম্যদার সঙ্গে যাওয়া প্রকৃতি কর্মীদের উৎসাহের অন্ত নেই।সৌম্যদা ওদের সামনে দেখতে পাওয়া পাখিগুলির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। প্রকৃতি সংরক্ষণের দুই-চারটি জ্ঞাতব্য কথা বলে চলেছেন।প্রতিঘর মানুষ গাছের চারা সংরক্ষণে আন্তরিকতার সঙ্গে যত্ন করতে দেখে তাদেরকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

  সৌম্যদা এসে আমার সামনের খোলা জায়গাটায় বসেছেন।বসে থাকা প্রকৃতি কর্মীদের সামনে দাঁড়িয়ে সৌম্যদা তাদের বিভিন্ন প্রশ্ন করে চলেছেন।সৌম্যদার কাছে একটি পুঁটলি।পুঁটলিতে কী আছে আমি জানি না।সৌ্ম্যদা প্রকৃ্তি কর্মীদের জিজ্ঞেস করছে---তোমাদের মধ্যে কে কে গাছের চারা রোপণ কর এভবগ দেখাশোনা করার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃ্তি সংরক্ষণে বিশেষ পারদর্শিতা দেখিয়েছ?তাঁদের নামগুলি তোমাদের মাঝখান থেকেই বল।এমনিতেই বলে দিও না।একজন প্রকৃ্তি কর্মীকে সৌম্যদা নামগুলি লিখে যেতে বলল।

 উঠে দাঁড়িয়ে একজন বলল—নয়ন।

 নয়নের কথা আমার মনে পড়ল।নীতি নির্ধারক কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকার সময় সে আমাকে একজন মানুষের গাছ কাটা দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল।

অন্য একজন বল—অবিনাশ।

 ঠিকই বলেছে প্রকৃতি কর্মীটি।অবিনাশ একটা ভামকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছে।প্রায় পঞ্চাশজন প্রকৃ্তি কর্মী দল থেকে এরকম দশজন প্রকৃ্তি কর্মীকে নির্বাচন করে বের করা হল।সৌম্যদা বলায় ছেলেটি বিশেষভাবে পারদর্শী প্রকৃ্তি কর্মীদের নামগুলি পুনরায় আওড়ে গেল।

 --তোমাদের কারও কোনো ওজর আপত্তি আছে।

 নাই বলে প্রকৃ্তি কর্মীরা সামগ্রিকভাবে হাততালি দিয়ে সমর্থন জানাল।

 সৌ্ম্যদা একজন প্রকৃ্তি কর্মীকে তার কাছে থাকা পুঁটলিটা খোলার জন্য বলল।পুঁটলিটা খোলার পরে সবাই দেখতে পেল তাতে কয়েকটি স্পোর্টিং গেঞ্জি রয়েছে।সৌ্ম্যদা তারই একটা হাতে নিয়ে সবাইকে দেখাল।সাদা রঙের গেঞ্জিটার সামনের ভাগে একটা দহিকতরার (এক ধরনের মিষ্ট কণ্ঠের পাখি)ছবি।আর পেছন দিকে টাইপ করে লেখা আছে দহিকতরা।শব্দটির নিচে একটা আঁচ।আঁচটার নিচে হাতের অক্ষরে লেখা আছে –দশের হিতে কাজ ত্যাগের সঙ্গে কর।সৌ্ম্যদা বিশেষ পারদর্শিতা প্রদর্শন করা প্রকৃ্তি কর্মীদের এক একটা স্পোর্টিং গেঞ্জি উপহার দিল।

 — এটা তোমাদের করা ভালো কাজের বিপরীতে দেওয়া সম্মান। এই সম্মান তোমরা ধরে রাখতে চেষ্টা করবে। যারা এই সম্মান আজ লাভ করনি, কাল লাভ করার জন্য তোমরাও চেষ্টা করবে। নিশ্চয় পারবে। এই স্পোর্টিং যেখানে সেখানে পরে যাবে না। সম্মানজনক স্থানে পরবে।

 সৌম্যদা দুজন প্রকৃতি কর্মীর মাধ্যমে সুনন্দ, নবজিৎ বৈশ্য, পুলক, রাতুল, কীচক ,অচ্যৃত , অনামিকাদের ডেকে এনে দশ জনকে সম্মানজনক স্পোর্টিং প্রদান করল।

 গাছের নিচের চেয়ারটাতে একা বসে অবচেতনভাবে আমি এই দৃশ্যগুলি দেখতে পাচ্ছি।আমি দেখতে পাচ্ছি অনামিকা আমার দিকে এগিয়ে আসছে। অনামিকার বেশভূষা দেখে আমি আশ্চর্য হয়ে পড়লাম। আশ্চর্য নয়, বলা যেতে পারে আপ্লুত হয়েছি। সে দহিকতরা স্পোর্টিং পরার সঙ্গে সৈনিকরা ব্যবহার করা একটা সবুজ প্যান্ট এবং সৈনিক ব্যবহার করা একজোড়া কাপড়ের জুতো পরে এসেছে। উপস্থিত প্রত্যেকেই একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমি উঠে দাঁড়ালাম এবং স্যালুট প্রদর্শন করে অভিবাদন জানালাম। সবার সামনেই সে আমাকে জড়িয়ে ধরল। তার দুচোখ থেকে উষ্ণ অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। কিছুক্ষণ পরে সে আমাকে ছেড়ে দিয়ে দুই হাতে মুখটা ঢেকে ধরল। আমি জানতে পারলাম না সে জ্যোতিষ ব্যবহার করা পোশাক পরিধান করে এভাবে জ্যোতিষকে স্মরণ করছে, না জ্যোতিষের আদর্শ সামনে রেখে নতুন জীবনটা আরম্ভ করবে বলে স্থির করেছে। আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকা প্রত্যেকেই পুনরায় নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

 কিছুটা লাজুক ভাবে অনামিকা এসে আমার পাশে বসলো এবং সে হঠাৎ নিজেকে বদলে ফেলল।

 —ইস। আপনি একা বসে আছেন। আপনাকে লক্ষ্য করছি আপনি গত দুদিন থেকে আমাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে আপনি দূরত্ব বজায় রাখছেন। আপনি চা খেয়েছেন?

অনামিকা একসঙ্গে জিজ্ঞেস করা প্রশ্নগুলির কোনটির উত্তর দেব আমি ঠিক করতে পারছি না।

 — খাইনি।

 আমি চা খাই নি বলে সাধারণভাবে বলে রাখলাম। সে আমাকে কিছু না বলে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। পেছন থেকে তাকে সামরিক বাহিনীতে কাজ করা কোনো মহিলা অফিসারের মতো দেখাচ্ছে। আমি জানিনা, অসমের অন্য কোনো গ্রামে হলে অনামিকা এভাবে এগিয়ে আসতে পারতেন কিনা। কিন্তু বর কুরিহা গ্রামটি সত্যিই আদর্শগত ভাবে ব্যতিক্রম। কার ও প্রতি কুনজর দেবার জন্য এখানে প্রত্যেকেরই যেন সময়ের অভাব। অনামিকা এক কাপ চা এবং একটা নিমকি নিয়ে ফিরে এলেন। আমি তার হাত থেকে শুধুমাত্র এক কাপ চা নিলাম।

 — নিমকি খাবেন না?

 — না খাই না।

 —কেন?

 — ইচ্ছা নেই।

 অনামিকা গুমোট ভাবে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।

 — আপনার দেখছি আজকাল কোনো কিছুতেই ইচ্ছা নেই।

 অনামিকা কোনোরকম ভুল বলছে না। সত্যি। শেষ পর্যন্ত কোনো কিছুতেই আমার ইচ্ছা নাই হয়ে গেছে।

 আমি ভাবতে শুরু করেছি আমার ইচ্ছার কোনো অংশ পূরণ হল মানে আমার করার কাজ শেষ হয়ে গেল। কখন ও আবার ভাবি মনের মধ্যে কল্পনার সৌধ না তৈরি করে আমি কীভাবে বেঁচে থাকব। গ্রামটি অরণ্য হয়ে উঠতে আর ও পাঁচ বছর সময় লাগবে।

 — কী হল, কিছুই বলছেন না দেখছি?

 — অনেক প্রশ্নের উত্তর না থাকার মতো অনামিকা, আমার হাতে তোমার তোমার প্রশ্নেরও উত্তর নেই।

 আমি নিজের কাছ থেকে অথবা আইনের কাছ থেকে পালাতে চাইলে প্রশ্নের উত্তর না থাকার অজুহাত দেখাই অথবা এভাবে সিদ্ধান্ত নিই। আমার মনের মধ্যে মাঝেমধ্যে উঁকি দেওয়া নিরাশা এবং হতাশায় অন্যের উৎসাহে ঠান্ডা জল ঢালা অনুচিত। সমস্ত কিছু অনির্ণেয় বলে ভাবলেও, কাজের ফলাফল আছে বলেই আমি অনির্ণেয়তাকে ধ্যান করে হাত গুটিয়ে বসে থাকি না।আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য চেষ্টা করলাম।

  --না অনামিকা।আমি মাঝে মধ্যে আমার সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসি। আমি ভাবি পৃ্থিবীতে আমার চেয়ে আমার অন্য কোনো ভালো সঙ্গী থাকতে পারে না।আমি আমার সঙ্গে থাকলে জানই তো ,আমার জন্য বাস্তব পৃ্থিবীটা পরিবর্তিত হয়ে যায়।কখনও নিজের সঙ্গে সময় কাটিয়ে দেখ।

 উদয়নদা, আমি ক্ষণিকের জন্য ভাবি না আমার পৃথিবীটাতে শুধু আমি বসবাস করছি। আমার পৃথিবীটা বহুমাত্রিক। সেখানে সবাই থাকে। আমার সম্পর্কিতরা, বন্ধুবান্ধবরা, পরিচিত অপরিচিত অনেকেই। সেই পৃথিবীতে থাকে প্রাকৃতিক এবং অপ্রাকৃতিক বিচিত্র সম্পদ এবং ঘটনা রাজি। জীবন চক্রের বাস্তব পরিঘটনা।।এই সমস্ত কিছুকে অস্বীকার করে আমি শুধু আমার সঙ্গে জীবন কাটাতে অনিচ্ছুক।

 অনামিকা আমাকে আমার পৃথিবী থেকে বের করে আনল। তার মানে আমার জন্য দুটি পৃথিবী,একটিতে আমি একা থাকি অন্যটিতে আমি এবং আমার সঙ্গে থাকে অনেকেই। যান্ত্রিকতা এবং প্রাকৃতিকতার মধ্যে বিচরণ করে আমার মনের মধ্যে দুই চিন্তার ধ্বংসাবশেষ আমি গড়তে চাইছি নাকি? আমি নিজেকে লুকানোর জন্য চেষ্টা করলাম।

 আয়োতিরা নাম প্রসঙ্গ করার জন্য প্রস্তুত হয়েছে কি অনামিকা? ও দাঁড়াও, সৌম্যদা এবং তার সঙ্গে যাবার ছেলেমেয়েগুলোর দলটি খাওয়া দাওয়ার দিকে তুমি একটু লক্ষ্য রাখবে।

—আয়োতির দলটি নাম প্রসঙ্গ ইতিমধ্যে আরম্ভ করেছে। আপনি বোধহয় সেদিকে খেয়াল করেননি। প্রকৃতি কর্মী ছেলেমেয়েদের জন্য বেলের শরবত এবং ওদের জন্য প্রত্যেকের সঙ্গে খিচুড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে।।

 অনামিকা বলার পরে আয়োতিদের করতালি তালের শব্দ এবং বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনি এসে আমার কানে লাগল। নিজের পৃথিবীতে যে এরকমই। নিজেকে সম্পূর্ণ নিজের সঙ্গে ব্যস্ত করে রাখে।

—-আমি আসছি। আমার একটু কাজ আছে। আপনার কাজ একেবারে শেষ হয়ে যাওয়া বলে কেন ভাবছেন? বহির্মুখী একজন মানুষ হঠাৎ অন্তর্মুখী হয়ে যাবেন না।এবার বৈশাখে দেখবেন গাছের চারাগুলি দ্রুত বেড়ে চলেছে।নতুন নতুন পাতা বের হবে।ওরা একফুট উঁচু হবে।গাছের চারাগুলির আগে মনগুলি বেঁধে নিলে আমরাও ওদের মতো উঁচু হয়ে যেতে থাকব।

তাজ্জব ব্যাপার।আমি হতচকিত হয়ে পড়লাম।অনামিকা আমার নিজস্ব পৃ্থিবীটা খান খান করতে চেষ্টা করছে।অরণ্য গ্রাম এবং পর্যটক নিবাসের কাজ করার পর থেকে মা আমার সঙ্গ ত্যাগ করেছে।

আমি চেয়ার থেকে উঠে এসে আয়োতিদের নাম-পর্ব শুনতে লাগলাম।সুর দিয়ে গাওয়া তাঁদের সঙ্গী্তের কথাগুলি একেবারে অব্যর্থ ।এটি পুনরায় এরকম পৃ্থিবী যেখানকার সমস্ত বাসিন্দা কর্মবিমুখ হতে ইচ্ছুক।আর আমার এরকম মনে হয় তাঁরা যেন সামূহিকভাবে আত্মহত্যা করার জন্য অপেক্ষা করছে।

এতদিন মনে না আসা চিন্তাগুলি আজ হঠাৎ আমার মনে কেন আসতে লাগল।বাপুটি কোনোভাবে জানতে পারলে সে এসে বলবে—আমি বলেছিলাম না,আপনাকে ভূতে পাবে।এখন আপনাকে ঝাঁড়ফুক করতে হবে।

পুরোহিত শর্মা এসে আমার পাশে বসল।

--আপনার পাশে এসে বসাটাই এখন ভাগ্যের কথা।

এবার পুনরায় আমার পাশে এসে বসল ভাগ্য।সবাই নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত।আজ আমার সেরকম ব্যস্ততা নেই।সময় পার করার জন্য আমি পুরোহিত শর্মাকে ঘিরে ধরলাম।

--ভাগ্য মানে পুন্য।ভাগ্য মানে ঈশ্বরের সুমতি।ভাগ্য মানে মন চাওয়া সফল।শর্মাবাবু ভাগ্য মানে কি?

পুরোহিত শর্মা আমার কাছ থেকে এই ধরনের প্রশ্ন আশা করেন নি।

--ভাগ্য মানে কী হবে?আমরা যা চাই তা পাওয়া তো।না পেলে দুর্ভাগ্য।আমরা বলি সেটা কপালেই লেখা থাকে।

--আমার কপাল আপনি পড়তে পারবেন শর্মাবাবু?

--কেউ কারও কপাল পড়তে পারে না।সেইজন্য হয়তো আমরা ভাগ্য এবং দুর্ভাগ্যকে শ্লেটে আঁকতে পারি না।পারলে বলতে পারতাম আগামীকাল আপনার জীবনে কী হতে চলেছে।

শর্মার মন্তব্য শুনে থাকা অবস্থায় দেখতে পেলাম সৌ্ম্যদা ছেলেমেয়েদের দলটিকে নিয়ে ভাত খাবার ঘরে এসেছে।তিনি সোজাসুজি আমাদের কাছে এলেন এবং প্রকৃ্তি কর্মীদের ভাত খাবার ঘরে যেতে বললেন।আমি তার দিকে একটা চেয়ার এগিয়ে দিলাম।পুরোহিত শর্মার সঙ্গে অদৃষ্টকে নিয়ে আর বেশি কথা বলা হল না।

--তুমিও আমাদের সঙ্গে যেতে পারতে।গাছের চারাগুলি সুন্দরভাবে গড়ে উঠছে।গ্রামের প্রায় প্রতিঘর মানুষই গাছের চারাগুলিকে খুব সুন্দরভাবে যত্ন করছে।গোয়ালঘরের গরু এবং চারাগাছটির মধ্যে তারা কোনো পার্থক্য করছে না।দুই তিন বছরের মধ্যেই গ্রামটা পুরো সবুজ হয়ে উঠবে।

সবুজ হতে চলা গাছের চারাগুলির কাছ থেকে ফিরে এসে সৌ্ম্যদা পুরো মানুষটা সবুজ হয়ে পড়েছে বলে আমার মনে হল।আমরা অনেকক্ষণ ধরে সবুজ হতেঁ চলা অরণ্য গ্রামটি সম্পর্কে কথা বললাম।অনামিকা এসে কিছুক্ষণ আমাদের কাছে বসল।সে আমার মনোভাব বুঝতে পারল না।এক ঘণ্টা আগের মানুষ একজন একঘন্টা পরে কীভাবে বিশেষভাবে বদলে যেতে পারে,হয়তো তার চিন্তা এবং বোধের ধারণার বাইরে ছিল। তবে আমি সেকথা জানি। একজন মানুষ চিন্তা জগত থেকে বাহনের পিস্টনের মতো বাইরে-ভেতরে করতে থাকে।সেই পিস্টনের মসৃণতা নির্ভর করে চিন্তার তৈলাক্ততার ওপরে।

দিনটা আমার কাছে বিচ্ছুরিত চিন্তা এবং কল্পনার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হল।

অনামিকা হয়তো আমাকে জানতে বা বুঝতে এসেছিল,হয়তো সে ভেবেছে আমি নিজেই একটা রহস্য।

মাথার ওপরে ধীরে ধীরে উঠে এসেছে বিশাল আকৃ্তির চাঁদ।দশদিক রূপোলি জ্যোৎস্নায় ভরপুর।শীতল বাতাস এবং রাশি রাশি শিশিরের কণা অনন্য পরিবেশের সৃষ্টি করেছে।অভিনেতা মৃদুল ভূঞা এবং প্রস্তুতি পরাশর ফিতা কেটে আমাদের স্বপ্নের পর্যটক নিবাসকে বাস্তবে উপস্থাপন করল।আগামীকাল থেকে তারা আমাদের অতিথি হবে।।উলুধ্বনি এবং হাততালির মধ্যে ফিতার বাইরে থাকা প্রকৃ্তি কর্মিরা পর্যটনক্ষে্ত্রে প্রবেশ করছে।অস্বচ্ছ আলোতে ঝি্লমিল করে উঠছে পর্যটন মণ্ডল।তারা এক এক করে প্রতিটি ঝুপড়িতে প্রবেশ করছে।মন্তব্য দিতে গিয়ে বলছে অনন্য।গ্রন্থাগারটিতে ঢুকে তারা অতিশয় আপ্লুত।প্রকৃ্তি কর্মীর জন্য,পর্যটকদের জন্য গ্রন্থাগার ,তারা ভারতবর্ষের কোনো পর্যটন ক্ষেত্রে নাকি এই ধরনের সাত্তিক প্রচেষ্টা দেখতে পায় নি।বিভিন্ন জন প্রকৃ্তিকর্মী,এমনকি ভরত এবং নরেনও তাদের সঙ্গে সেলফি উঠছে।পর্‍্যটকের মন্তব্য খাতায় তাঁরা আবেগের সঙ্গে লিখেছে –পরম করুণাময় পর্যটক নিবাসটিকে সুদৃষ্টি প্রদান করুক।

সৌম্যদাকে সঙ্গে পেয়ে দুই অভিনেতা এবং অভিনেত্রী আন্তরিকতার সঙ্গে বার্তালাপ করছে।গণ্ডারের খড়গের হিসেব বহির্ভূত এবং বেসরকারি বিশৃঙ্খল সম্পর্কে সৌ্ম্যদা নেওয়া ভূমিকার প্রশংসা করছে।সমস্ত ধরনের সাহায্যের আশ্বাসও দিয়েছে।এগুলিই সামাজিক দায়বদ্ধতার ধনাত্মক দিক।

পরম্পরাগত আতিথ্যে অভ্যাগতদের অভ্যর্থনা করার পর্ব চলছে।

আজকের দিনটিতে আমি আমাকে সমস্ত ব্যস্ততা থেকে সরিয়ে রেখেছি।তাই বহুদিনের মাথায় আমি আজ সম্পূর্ণ চাঁদটিকে নিজস্ব আকাঙ্খায় প্রত্যক্ষ করার সুবিধা লাভ করেছি।আমি একপা দুপা করে পাখিদের পাড়া পড়োশির দিকে এগিয়ে গেলাম।চোখের আড়ালে সমৃদ্ধ সারি সারি গাছের চারার মধ্য দিয়ে আমার সঙ্গে চাঁদ ও হাঁটতে লাগল।পাখিদের পাড়া প্রতিবেশীর মৃত শিশু গাছটির হেলানো জায়গাটিতে বসে আমি সামনের শিমূল গাছ দুটির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছি।চাঁদের আলোতে শিমূল দুটির ছায়া কেঁপে কেঁপে জলাশয়ের জলে নৃ্ত্য করছে। নিবারণের জন্য অকালে হারানো শিমূল গাছটির কথা আমার খুব মনে পড়ে গেল।সেই গাছটিতেই বকের সংসার পাতার জন্য প্রাণপনে চেষ্টা করছিল।জলাশয় থেকে ভেসে আসা একটা ঠান্ডা বাতাস আমাকে ক্ষণিকের জন্য নাড়া দিয়ে গেল।আমি দেখতে পাওয়া শিমূল গাছদুটির উঁচু শিমূল গাছটাতে কয়েকটি বকের ছায়া মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে।ওরা চাঁদকে ঢেকে ফেলার ব্যর্থ চেষ্টা করছে।পাখিদের পাড়াপড়োশীর আবাসীদের দেখতে পেয়ে আমি আত্মহারা হয়ে পড়লাম।দিনটির সমস্ত ঋণাত্মক চিন্তাকে মুছে ফেলার জন্য আমি সম্ভবত এই মুহূর্তটির জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।

প্রাকৃ্তিক চেয়ারটিতে বসে থাকা থেকে আমি দেখতে পেলাম কেউ একজন আমার দিকে এগিয়ে আসছে।আমার খোঁজে এসে অনামিকা পাখিদের পাড়া পড়োশিতে পৌছে গেল নাকি?


শনিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৪

আমার বিরহ বর্ষা ।। সঞ্জয় ব্যানার্জী ।। কবিতা, Sanjay Banerjee

আমার বিরহ বর্ষা

সঞ্জয় ব্যানার্জী



রিমঝিম বৃষ্টির ধারা ঝরছে

আমি বসে আছি জানালার পাশে

মন আমার ভারাক্রান্ত নাগপাশে। 


আমার বিরহ বর্ষা তুমি এলে

সব আনন্দ আমার কেড়ে নিলে

আমার বান্ধবী তুমি মনমরা

রিমঝিম শ্রাবণ বেলা।


তুমি এলে আমার আঁখির অশ্রু নিয়ে

কাটে নাকো বেলা তোমার রিমঝিম শব্দ শুনে

আমার প্রেমিকা জানালার পাশে বসে--

আমারই পথ চেয়ে।


রবিবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৪

পাখিদের পাড়া পড়শী- ৩// ১০ পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস, Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider Para Porshi তৃতীয় অধ্যায়, দশম অংশ

 পাখিদের পাড়া পড়শী- ৩// ১০


পঙ্কজ গোবিন্দ মেধি   


মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস,  

Pankaj Gobinda Medhi, Pakhider Para Porshi

তৃতীয় অধ্যায়, দশম অংশ 



(দশ)

 সৌম্যদা টেন্ট পাততে চাওয়া শিবিরটা ব্যস্ততার জন্য আমরা পিছিয়ে দিতে বাধ্য হলাম। আমি সৌম্যদাকে বললাম—সৌম্যদা আমাদের কাজগুলি সুষম গতিতে এগিয়ে চলেছে। এখন টেন্ট শিবিরে ব্যস্ত হলে দৈনন্দিন কাজগুলিতে অসুবিধা হবে। টেন্ট শিবিরটা আমরা এখন অনুষ্ঠিত না করে পিছিয়ে দিলে ভালো হবে। নলবাড়িতে রাসমহোৎসব অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় শিবিরের আয়োজন করলে অংশগ্রহণকারীরা একটি বিশেষ অনুষ্ঠান দর্শন করার সুযোগ এবং সুবিধা লাভ করবে। তখনই অনুষ্ঠিত করা ভালো হবে নাকি? সৌম্যদা আমার সঙ্গে একমত হলেন। আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম আমাদের পর্যটক নিবাস মুক্ত করার পরের দিন আমরা আমাদের টেন্ট শিবির উন্মোচন করব। আমরা পর্যটক নিবাস তৈরি করার কাজের খবর লাভ করে রাস কমিটি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তাঁরা আমন্ত্রণ করা থিয়েটারের বিশিষ্ট অভিনেতা অভিনেত্রীদের জন্য থাকার অসুবিধা। নলবাড়ির হোটেলগুলি চাহিদা পূরণ করতে পারবেনা। আমরা বলেছি রাস পূর্ণিমার দিনেই যেহেতু আমরা উদ্বোধন করার কথা ভাবছি, আপনারাই প্রথম গ্রাহক হতে পারেন।

 এই সমস্ত কথার সঙ্গে আমি সৌম্যদাকে আমাদের কাজেরও অগ্রগতির সম্পূর্ণ আভাস দিলাম। জানালাম ঝুপড়িগুলি প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। আপনার পাঠানো মানুষ দুটি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজগুলি সম্পন্ন করেছে। মানুষ দুটি কর্মঠ। কারেন্ট এবং জলের সরঞ্জাম গুলি আনা হয়েছে। রান্নাঘর এবং কাজ করা মানুষ থাকার জন্য ব্যবহার করা ঘর গুলির মেঝে পাকা করা কাজ সম্পূর্ণ হবে।

 সৌম্যদা গাছের চারা রোপণ করার কথা জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। প্রতিটি বাড়ির মানুষ তাদের বাড়ির পরিসরে গাছের চারা রোপণ করার অনুমতি দিয়েছে। দু একজন প্রথমে দিচ্ছিল না, পরে আমাদের স্বার্থহীন মনোভাবের কথা জানতে পেরে আমাদের নিমন্ত্রণ জানাল। দুই একটি বাড়ির লোকেরা গাছের চারা রোপন করতে যাওয়ার পরে গামছা দিয়ে সম্বর্ধনা জানাল। আমি অত্যন্ত আপ্লুত হয়ে সৌম্যদাকে জানালাম।

 —ভালো কাজ করলে, ভালো ফলাফল পাবে। মনে পড়ায় বলে রাখি, তোমাদের মধ্যে যিনি পর্যটক গৃহ সমূহ পরিচালনা করবেন তাদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার প্রয়োজন আছে। তিনি যদি প্রকৃতি পর্যটনের ক্ষেত্র সমূহ দেখেননি, তাহলে তাকে দেখানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এক কথায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

 —সৌম্যদা। একজন নয়, তিনজনের মতো পাঠাতে হবে। তখন তারা একত্রিত হয়ে কাজ করতে পারবে। একজনকে পাঠালে অনুষ্ঠানে তাঁর মাতব্বরি বেড়ে যাবার আশঙ্কা আছে।

 —উদয়,তুমি ঠিকই বলেছ। তিনজনকেই পাঠিয়ে দাও। আমি শৈলেশদাকে বলে রেখেছি। আজ পুনরায় মনে করিয়ে দেব। এখনই পাঠিয়ে দিলে নিবাসটা আরম্ভ করার সময় তুমি ওদের দায়িত্ব দিতে পারবে। ওরা যদি নিবাস নির্মাণের কোনো দায়িত্বে আছে তিনজনকেই আজ তার থেকে মুক্ত করে দাও।

 —আমি সম্পাদককে নীতিনির্ধারক কমিটি একটি সভা আহ্বান করার জন্য অনুরোধ করব। তাতেই তাদের তিনজনকে নির্বাচন করা হবে এবং অভয়াপুরির শৈলেশদার আস্থানায় প্রশিক্ষণের জন্য প্রেরণ করা হবে।

 সৌম্যদার সঙ্গে কথা অনুসারে সকালবেলা আমি সুনন্দের বাড়িতে উপস্থিত হলাম।সুনন্দ পনেরো দিনের জন্য ছুটি নিয়ে বাড়িতে আছে।আমি সুনন্দকে নীতি নির্ধারক কমিটিটার বৈঠক আহ্বান করার জন্য অনুরোধ জানালাম।আমরা কয়েকটি বিষয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন আছে।সুনন্দ জিজ্ঞেস করল –আগামীকাল? আমি বললাম—যত তাড়াতাড়ি পারা যায়!সুনন্দ আমাকে জিজ্ঞেস করল আমি অনামিকাকে জানিয়েছি নাকি?আমি বললাম জানাই নি,তুমি জানিয়ে দিও।আমার মনে হয় অনামিকা কাজের তদারকি করার জন্য দশটার সময় সেখানে যাওয়া উচিত।আমি তাকে বলেছিলাম সে কাজগুলিকে গুরুত্ব দেয় নি।সম্পাদক গুরুত্ব না দিলে কীভাবে হবে!সেইজন্য ভাবছি সে ওখানে যাবে।তুমিও যাবে।আলোচনার মাধ্যমে কাজগুলিকে এগিয়ে নিতে হবে।তিনটি ছেলে নির্বাচন করে পরিচালনার প্রশিক্ষণের জন্য পাঠাতে হবে।রাঁধুনি দুজনের কথাও এখন চিন্তা করতে হবে।আমাদের মধ্যে কোনো প্রকৃ্তি কর্মীর রন্ধন দক্ষতা বা রন্ধন প্রকরণে জড়িত হওয়ার ইচ্ছা থাকলে আমরা প্রশিক্ষণ দিয়ে নিতে পারব।আমাদের পর্যটক নিবাসের দ্বার উন্মোচন করার মুহূর্ত থেকে আমাদের সুদক্ষ পরিচালক,রন্ধন কর্মী এবং সহায়কারীর প্রয়োজন হবে।তাঁদের প্রত্যেককেই পরিবেশ কর্মী হতে হবে,তাঁদের ব্যবহারে থাকতে হবে অতিথি পরায়ণতা।

 সুনন্দের বাড়ি থেকে আমি বিদায় নিয়ে সোজাসুজি নির্মাণ স্থলের উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেলাম।বাঁধ থেকে নেমেই দেখতে পেলাম কিছুটা সামনে দিয়ে অনামিকা যাচ্ছে।অনামিকার হাতে একটি ব্যাগ।জানি না ব্যাগে কী আছে।অনামিকা সোজাসুজি কাজের লোকদের থাকার জন্য তৈরি বাড়িটার দিকে যাচ্ছে।সে সেখানে ব্যাগটা রেখে ইতিমধ্যে নির্মাণ সমাপ্ত হওয়া ঝুপড়ি দুটোতে ঢুকেছে।ঝুপড়ি দুটোর বিদ্যুৎ এবং জল জোগানোর সাজসরঞ্জাম গুলি লাগানো হয়েছে।আজ ব্যবহৃত বাঁশে পোকা না ধরার জন্য ঔষধ ছিটিয়ে দেবে আর তারপরে বার্নিশ করবে।এই কাজটুকু করলে ঝুপড়ি দুটিতে বিছানা পাতা এবং অন্যান্য সামগ্রী ঢোকানো যাবে।বাকি দুটি ঝুপড়ির বিদ্যুৎ জল পরিবহনের সরঞ্জামগুলি লাগানোর কাজ বাকি রয়েছে।আগামী দুদিনে সেই কাজটুকুও সমাপ্ত করতে হবে।আগামী দশ দিনের মধ্যে স্বপ্নের পর্যটন নিবাসটি বাস্তব রূপ লাভ করবে।

 আমাকে আসতে দেখে অনামিকা এগিয়ে এল।আমি গাছের নিচে পেতে রাখা একটা চেয়ারে বসলাম,সেও এসে পাশের চেয়ারটাতে বসল।

 --কোথাও গিয়েছিলেন?রুমে দেখতে পেলাম না যে!

 তোমার কী প্রয়োজন—ভেবেছিলাম এভাবে বলব।সকাল সকাল ওকে অপদস্থ করতে ইচ্ছা হল না।

 --সম্পাদকের ঘরে গিয়েছিলাম।

 --আমি কোনো সম্পাদক নই নাকি?না কি সম্পাদিকার ঘরে যান না?

 --সম্পাদিকা নিজের দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করছে।সম্পাদক করছে না বলে তার ঘরে যেতে হল।আমাদের দুজন সম্পাদক বলে খারাপ হয়েছে।তবে তোমরা দুজন মিলিত হয়েছ কি?ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কী ভাবছ?

 --আপনাদের এইজন সম্পাদকও এসেছে দাঁড়ান।মুখোমুখি কথাগুলি খোলশা করে নেওয়া ভালো হবে।

 কিছুক্ষণ পরে সুনন্দ এসে আমাদের সঙ্গে দেখা করল।

 --সুনন্দ, তুমি অনামিকার সঙ্গে কথাগুলি আলোচনা করেছ কি?দুজনে মিলে কথাগুলি আলোচনা করে মিলে-মিশে এগোবে।আমি আজ আছি,কাল নেই।নভেম্বরের শেষে আমার ছুটি শেষ।আমি চলে যাব।তোমাদেরই সবাইকে পরিচালনা করতে হবে।তোমাদের মধ্যে বিপিন ডেকা মানুষটি ভালো।তার উপরে নির্ভর করতে পার।

 --আপনি যে আমাদের মাঝখান থেকে চলে যাবেন,সেটা তো ভাবতেও খারাপ লাগে।

 --উপায় নেই।একেই বলে চাকরি।চাকুরীজীবীরা অতি বেশি সময়ের দাস।যাই হোকনা কেন তোমরা সংগঠনের নামে থাকা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে তোমাদের সভাপতি সম্পাদকের সইয়ের দ্বারা টাকা উঠানোর মতো ব্যবস্থা করে নেবে।কমিটি গঠন হওয়ার আগেই অ্যাকাউন্টটা খোলা হয়েছিল বলে আমার নামেই করা হয়েছিল।পঞ্জীয়নের জন্য ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের প্রয়োজন।ব্যাঙ্ক অফিসার হিসেবে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য আমার সুবিধাও ছিল।এখন যেহেতু পঞ্জীয়ন হয়ে গেছে প্রত্যেককেই নিয়মের মধ্য দিয়ে এগোনো ভালো।তোমরা দুজন আগামীকাল গিয়ে কাজটা এগিয়ে রাখবে।সঙ্গে নীতি নির্ধারক কমিটির একটি বৈঠকও আগামীকাল অনুষ্ঠিত কর।সেখানে আমাদের আগামীকাল কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।বিশেষ করে তিনটি ছেলেকে পর্যটক নিবাস পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য অভয়াপুরীর আস্থানায় পাঠাতে হবে।নিবাস দেখা-শোনার জন্য ব্যবস্থা করা রাঁধুনি এবং সহায়কদের বিষয়েও আলোচনা করতে হবে।নিরাপত্তা রক্ষী নিয়োগ করতে হবে।সে কথাও আলোচনা করতে হবে।ভবিষ্যৎ কার্যপন্থা কীরকম হবে আলোচনা করার জন্য পর্যটকনিবাস সমিতিটাও তৎকালে গঠন করতে হবে।দ্রুততার সঙ্গে করার মতো কয়েকটি কাজ আছে।

 আমি সুনন্দর দিকে কথাটা বলতে থাকার মধ্যে অনামিকা উঠে যাবার জন্য প্রস্তুত হল।

 --কোথায় যাচ্ছ।আমার কথায় গুরুত্ব দিচ্ছ না নাকি।

 --এভাবে কেন বলছ উদয় দা।আপনি এরকমম ভাবলে খারাপ লাগে।আমি ব্যাগটা আনতে যাচ্ছি।

 --যাও।যাও।

 কাজ করা লোকদের জন্য তৈরি হওয়া বাড়িটার জন্য অনামিকা ব্যাগটা নিয়ে এল।ব্যাগের ভেতর থেকে সে একটা ফ্লাস্ক,একটা টিফিন এবং তিনটি ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া গ্লাস বের করল।

 --অনামিকা বৌ্দি কী এনেছ?

 --সকালের জলখাবার।

 --বাঃ সুন্দর।এতক্ষণ বলনি কেন।দাও তাড়াতাড়ি দাও।আমিও বাড়িতে কিছু না খেয়েই চলে এসেছি।আসলে আমার মন বলছিল তুমি আমাদের জন্য বাড়ি থেকে কিছু নিয়ে আসবে।

 সুনন্দ এভাবে বললেও আমি বুঝতে পারছি অনামিকা এভাবে সকালের জলখাবার আনার কারণ কি।আমি যে ওকে বলেছিলাম তোমরা আমি এক কাপ চা খেয়েছি কিনা তাও জিজ্ঞেস কর না।আবেগিক মুহূর্তে আমার মুখ থেকে বের না হওয়া কথাটা বেরিয়ে গিয়েছিল এবং এটা তারই ফল।

 --কেন এনেছ এসব।প্রয়োজন ছিল না।

 --সত্যিই প্রয়োজন ছিল না নাকি?তাহলে রেখে দিচ্ছি।

 --বৌ্দি যা করার কর,মাত্র আমার অংশটুকু দিয়ে দাও।

 সুনন্দ অনামিকাকে খ্যাপানোর উদ্দেশ্যে বলল।

 ওকে এভাবে বললেও আমারও অবশ্য ক্ষুধা পেয়েছিল।হরিণের দোকানে সবসময় আসা যাওয়া হয় না।কখনও মেগী সিদ্ধ করে খেয়ে নিই।প্রায়ই খাওয়া হয় না।এভাবেই সারা দিন পার হয়ে যায়।জিজ্ঞেস করার মতো কেউ নেই।অনামিকা নিয়ে আসা কলাপাতায় দেওয়া পিঠা এবং লাল চা সহ আমাদের সকালের জলপান সুকলমে সম্পন্ন হয়ে গেল।

 পর্যটক নিবাস পরিচালনা করার প্রশিক্ষণের জন্য আমরা কাকে কাকে পাঠালে ভালো হবে অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করা উচিত।সঙ্গে দুজন রাঁধুনী।যদি আমাদের প্রকৃ্তি কর্মীদের মধ্যে কোনো ভালো রাঁধুনী থাকে ,সেরকম দুজনকে পাঠানো ঠিক হবে।

 --তিনজন পরিচালক নির্বাচনের জন্য আমরা একটা কাজ করি চলুন।তিনজনেই একটা একটা করে কাগজ নিয়ে তাতে তিনটা করে নাম প্রস্তাব করি।তিনজনের মধ্যে যে তিনজন বেশি প্রাধান্য লাভ করবে তাদের নির্বাচিত করা হোক।হবে তো?

 অনামিকার প্রস্তাবটা খারাপ মনে হল না।আমরা তিনজনেই তিনটা কাগজ হাতে নিলাম।কিন্তু একটা কলম ছিল বলে অনামিকাকে প্রথম নামটা লিখতে বললাম।তারপরে সুনন্দ এবং সবার শেষে আমি তিনজনের নাম লিখলাম।অনামিকাকে বললাম এখন তুমি কাগজ তিনটাতে থাকা নামগুলি ডেকে দাও।আমাদের তিনজনকেই অবাক করে দিয়ে আমরা তিনজনেই একই নাম তিনটা লিখলাম—অচ্যুত,পুলক আর রাতুল।আগামীকাল আনুষ্ঠানিকভাবে তিনজনের নামটা প্রস্তাব করবে এবং পরের দিন তিনজনকেই অভয়াপুরী যাবার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলবে।সকালের বহাগী নামের রেলটিতে ওরা তিনজন বঙ্গাইগাওঁ যাবে।

 স্টেশন থেকে অভয়াপুরীতে অনেক ছোটো গাড়ি চলাচল করে।তাঁরা তাতেই অভয়াপুরী যেতে পারবে।আমি সৌ্ম্যদার মাধ্যমে সমস্ত যোগাড়-যন্তর করে রাখব,কোনো সমস্যা হবে না।

 নীতিনির্ধারক কমিটির সভাটা আগামীকাল সন্ধ্যা চারটায় এখানেই করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হল।

 সেই অনুসারে নির্দিষ্ট সময়ের আগে তিনটার সময় অনামিকা এসে হাজির।হাতে একটা ব্যাগ।সারাদিনের কাজ কর্মের খতিয়ান নিয়ে আমি ঠান্ডা বাতাস পাওয়ার জন্য গাছের নিচে চেয়ার পেতে বসেছিলাম।নিজের অজান্তে আমি তন্দ্রালস হয়ে পড়েছিলাম।সামনে অনামিকাকে দেখে আমি চমকে উঠলাম।

 --চমকে উঠলে যে,উদয়দা,কোনো দিবাস্বপ্ন দেখছিলেন নাকি?

 যে অনামিকা আমি সামনে থাকলে কয়েকহাত দূরে চুপ করে থাকত, তুমি সম্বোধন করার পর থেকে দেখছি আজকাল ঝাঁঝালো সুরে কথা বলে। একই কর্ম ক্ষেত্রে কাজ করার জন্য আপন বলে ভেবেই বলেছে। অনামিকা চেয়ারে বসে ব্যাগ থেকে দুটো টিফিন বের করল। তারপরে নিন বলে একটা থালা আমার দিকে এগিয়ে দিল।

 — কী করছেন?

 — আগে ধরুন ।তারপর জিজ্ঞেস করবেন কী করছি।

 যন্ত্রের মতো আমি থালাটা হাতে নিলাম। অনামিকা টিফিন দুটির একটি খুলে দেওয়ায় জুহা চালের গন্ধ ভেসে এল।

 — আমি দিনের বেলা ভাত খাই না।

 —জানি, রাতেও খান না। খেতে না পেলে কোথা থেকে খাবেন?

 মাঝেমধ্যে আমি ধর্ম সংকটে পড়ি। কখনও ছোটো ছোটো কথায় কখনও বড়ো বিষয় নিয়ে। অনামিকা টিফিন বক্স থেকে ভাত এবং ভাজা বের করে আমি ধরে থাকা থালার উপরে ঢেলে দিয়ে টিফিন বক্সটা বন্ধ করে ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে নিল তারপরে অন্য টিফিন বক্সটা খুলে তার মধ্যে থাকা তরকারির সঙ্গে থাকা টিফিনটা আমার দিকে এগিয়ে দিল।

 — এখন আমি উঠলাম, তারা কি কাজ করছে দেখে আসি। আমি থাকলে আপনি খেতে লজ্জা পাবেন। আপনাকে তো জানি। ব্যাগের ভেতরে জলের বোতল আছে। বের করার কষ্টটুকু করে নেবেন।

 অনামিকা সোজাসুজি কাজ করতে থাকা লোকগুলির দিকে এগিয়ে গেল। সত্যি অনামিকা পাশে থাকলে আমার ভাত খাওয়া হত না। আর এখনও ভাতগুলি একান্ত বাধ্য হয়েই খেতে হচ্ছে। মাগুর মাছ আর ভেদাইলতা আলুর ঝোল। সবুজ ঝোলের মধ্যে নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকা আলুর টুকরো গুলির সঙ্গে নিজেকে তুলনা করতে কেন যে ইচ্ছা হল। তিন টুকরো বড়ো বড়ো মাগুর মাছ। আজকের দিনটাতে আমার জন্য রীতিমতো অভিজাত খাদ্য। অনামিকা আসার আগে আমি কোনো মতে ভাতটা খেয়ে নিলাম।

 — বোতলটা দাও।

 — আমি জল ঢেলে দিলে আপনার কোনো অসুবিধা হবে না। হাতটা ধুয়ে নিন।

পরিবেশটা আমার কেমন যেন ভালো লাগল না। তথাপি আমি অনামিকার সঙ্গে সহযোগিতা করলাম। জলের বোতলটা আবার তার হাতে ফিরিয়ে দিলাম। অনামিকা বাসনপত্র গুলি গুছিয়ে নিয়ে ব্যাগে ভরে পুনরায় আমার কাছে বসল। খাবার কেমন হয়েছে সেও আমাকে জিজ্ঞাসা করল না, আমিও কিছু বললাম না।

 — উদয় দা, চলে গেলে আমরা চালাতে পারব কি? তার চেয়ে আপনি বরং এখানেই থেকে যান।

 — চাকরি ছেড়ে দেব নাকি?

 — ছেড়ে দিন।

 এত তাৎক্ষণিকভাবে অনামিকা বলেছিল যে বেচারার প্রতি আমার করুণা জন্মাল। প্রায় লক্ষ টাকার একটা চাকরি ছেড়ে দেওয়া কি মুখের কথা । তথাপি অনামিকাকে জানতে এবং বুঝতে আমার ইচ্ছা হল।

 — আমাকে কে খাওয়াবে?

 — আমি।

 — কোথা থেকে?

 — পর্যটক নিবাস থেকে। আমার পেনশন থেকে।

 কাকাবাবুর বৌমা সত্যিই এখনও ছোট্ট মেয়েটির মতোই রয়েছে। সংসারে প্রবেশ করেছিল মাত্র। বুঝে ওঠার আগেই সমস্ত কিছু কেমন যেন গন্ডগোল হয়ে গেল। আমি আর তার সঙ্গে কথা বাড়াতে চাইলাম না। আমি ভাবলাম এখন থেকে আমাকে সংযত হতে হবে। আমি চুপ করে রইলাম।

 — কী হল উদয় দা। ভয় পেলেন। আমি জানি আপনার মতো সরল মনের মানুষ পর্যটক নিবাস চালাতে পারবে না। ব্যাবসা এভাবে হয় না। আপনি যা যা বলেন সবাই বিশ্বাস করে। বুদ্ধি করে খরচ করতে জানে না।

 আমি চুপ করে রইলাম। অনামিকা আমাকে বুঝতে চাইছে বলে মনে হল।

 আপনি এতটা কাজ এগিয়ে নিয়ে গেছেন অথচ একজন মানুষকেও কোনোদিন কোনো শক্ত কথা বলেন নি।

  — সেরকম ভাবে বলার প্রয়োজন হয়নি। ছোটো ছোটো কথাগুলি উপেক্ষা না করলে সংগঠন করবেন কীভাবে। সেই জন্য আমি সংগঠন করব আর তোমরা ব্যবসা। পর্যটক নিবাসের কমিটিটাতে আমি থাকব না, অরণ্য গ্রামের কমিটিতে থাকব। অরণ্য গ্রাম আমার স্বপ্ন।

 --আর পর্যটক নিবাস আপনার কাছে বাস্তব ।আপনি অস্বীকার করতে পারেন না। নিবাসটা বন্ধ হয়ে গেলে?

 —তোমাদের যতটুকু দরকার আমি করে দিয়েছি, এখন যা করবে তোমরা।

 — আপনার টাকা পয়সা গুলি বিফলে যাবে নাকি?

 — আমি বললাম— অনেক প্রশ্নের উত্তর না থাকার মতো এই প্রশ্নেরও কোনো উত্তর আমার হাতে নেই।

 —-আপনার হাতে উত্তর আছে আপনি সেটাই স্বীকার করতে চান না।

  অনামিকা আর আমি তর্কের সুরে কিছু সমস্যার সমাধান আলোচনা করছিলাম। তখনই পুলক এবং রাতুল এল। সুনন্দ এবং বিপিন ডেকা এল। চারটার সময় আমাদের সভা আরম্ভ হল। নীতি নির্ধারক কমিটির সভা। আমরা আলোচনা করা অনুসারে অচ্যুত পুলক এবং রাতুলকে প্রশিক্ষণের জন্য প্রেরণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম। আমাদের সিদ্ধান্ত শুনে তিনজনই খুব আনন্দ পেল।। ওরা দশ দিনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে যাবে সমস্ত ব্যবস্থা সৌম্যদা করে রেখেছে বলে সকাল বেলা আমাকে ফোন করে জানিয়েছে। রান্নার কথা উঠায় পুলক বলল তার বন্ধুও মায়াপুরে যে অ্যাপেটাইজার নামে রেস্টুরেন্ট আছে সেও নাকি দুজন রাঁধুনি দিতে পারবে। দুজনেই ভালো রাধুনী। আমি বললাম তাদের সঙ্গে চুক্তিপত্র করে নিতে হবে। অন্যথা মাঝ রাস্তায় চট করে চলে গেলে সমস্যায় পড়বে। অবশ্যই ওরা যখন কাজ করতে শুরু করবে তাদের দুজন থেকে তোমাদের কেউ কেউ রন্ধন রন্ধন প্রকরণের বিষয়ে শিখে নিতে হবে। তাহলেই রান্নার সমস্যার সমাধান হবে। স্থানীয় প্রকৃতি কর্মী না পাওয়া গেলে তোমরা ক্ষতিকর ভাবে দুজনকে অত্যন্ত সমীহ করে চলতে হবে।নীতি নির্ধারণ কমিটির সভায় আগামী রবিবার প্রকৃতি পর্যটন অর্থাৎ পর্যটক নিবাস এবং অরণ্য গ্রাম পরিচালনা করার জন্য দুটি কমিটি গঠন করতে হবে। কমিটির কোনো প্রকৃতি কর্মী যদি প্রকৃতি নিবাসে কাজ করতে চায় তাকে প্রাধান্য দেওয়াটা জরুরী বিবেচনা করতে হবে। সেই জন্য দুটি কমিটি গঠন করা অত্যন্ত প্রয়োজন। আজ বুধবার। আগামী রবিবার পর্যন্ত পারা যাবে কি? আমি নবজিৎ বৈশ্যকে জিজ্ঞেস করলাম। নবযুগের মতে না পারার কোনো কারণ নেই।

 আমরা সবার কাজ প্রায় শেষ করেছি। সেই সময় দেখতে পেলাম একদল ছেলে আমাদের দিকে দৌড়ে দৌড়ে আসছে। দলটির সবচেয়ে বড় ছেলেটির বয়স চৌদ্দ বছরের মতো হবে। তার পেছন পেছন বিভিন্ন বয়সের একদল ছেলে। সে দৌড়ে এসে আমাদের বলতে শুরু করল যে সেখানে একজন মানুষ একটা গাছ কাটতে শুরু করেছে। আমরা বাধা দেওয়ায় আমাদের মারার জন্য তেড়ে এসেছিল। তার বাড়ির গাছ সে কাটবে কিনা কাটবে সেটা নাকি তার নিজস্ব ব্যাপার।

  আমি নবজিৎকে বললাম দুটো গাছের চারা নিয়ে সঙ্গে চল।গাছের চারা দুটি নিয়ে আমরা ছেলেদের পেছন পেছন এগিয়ে গেলাম। আমরা গিয়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে মানুষটা গাছটা কেটে প্রায় ফেলে দেবার উপক্রম করেছিল। আমরা যখন তাকে জিজ্ঞেস করলাম গাছটা তিনি কি প্রয়োজনে এই সন্ধ্যা বেলা কাটতে শুরু করেছেন তখন তিনি বললেন এমনিতে থাকার চেয়ে কেটে ফেলব ভাবছি। আমি নবম শ্রেণির ছেলেটিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম তুমি এখন কাকুকে বুঝিয়ে দাও আমাদের কেন গাছ কাটা উচিত নয়।ছেলেটিকে আমরা কেউ কিছু শিখিয়ে দিইনি। সে একনাগারে একটা গাছের উপকারিতা সম্পর্কে বলে গেল। গাছ আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অম্লজান যোগায়।গাছ আমাদের ছায়া দান করে। ফলমূল দান করে আমাদের এখানকার মতো নদী তীরের অঞ্চলগুলিতে গাছ ভূমির ক্ষয় রোধ করে। গাছের শুকনো ডাল আমাদের কাছে ইন্ধন। কিন্তু সম্পূর্ণ গাছ একটা কেটে ফেললে আমাদের পরিবেশের উপরে তার খারাপ প্রভাব পড়বে। কথাটা বলে প্রথমেই ছেলেটি গাছ কাটা মানুষটার দিকে এবং পরে আমার দিকে তাকাল। ছেলেটির কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা প্রত্যেকেই জোরে হাতে তালি দিয়ে উঠলাম।ছোটো ছেলেদের দলটি চেঁচিয়ে উঠল। এটা ভেবে ভালো লাগলো যে আমাদের অজ্ঞাতসারে বরকুরিহা গ্রামে আমাদের পাখিদের পাড়া প্রতিবেশীতে বয়স নির্বিশেষে প্রকৃতি আন্দোলন জেগে উঠেছে।

  —দাদা এই ছোটো ছেলেটি বুঝতে পেরেছে গাছের উপকারিতা এবং আপনি অপ্রয়োজনে একটা গাছকে হত্যা করেছেন৷

  মানুষটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল। তিনি কী করবেন না করবেন বুঝতে পারছেন না। মানুষটাকে সহজ করে দেবার জন্য আমি বললাম এখন যা হবার হয়ে গেছে। যা হয়ে গেছে তাকে তো আর ফেরানো যাবে না। আপনি গাছটার কাছে একটা গাছের চারা লাগিয়ে দিন। আর ছেলেটি—কী কি নাম তোমার ভাই– নয়ন— এখন নয়ন তুমি অন্য গাছের চারাটা একটু দূরে লাগিয়ে দাও । মানুষটা একটা শব্দ ও উচ্চারণ না করে হাতে থাকা দা নিয়ে গর্ত খুঁড়তে লাগল। দুজনে দুটি চারা রোপণ করার পরে মানুষটাকে চারা দুটি প্রতিপালন করার জন্য অনুরোধ জানিয়ে নমস্কার করলাম।

 আসার সময় নয়নকে জড়িয়ে ধরে সুন্দর কাজের জন্য তাকে প্রশংসা করলাম এবং ছোটো ছোটো ছেলের দলকে বললাম— তোমরা আসবে , আমরা একসঙ্গে চারাগাছ লাগাব। ছেলেদের মধ্যে অরণ্য সংরক্ষণের মনোভাব জেগে ওঠা কার্যকে আমরা আমাদের সফলতা বলে বিবেচনা করছি।

 পরের দিন আমরা এরকম অন্য একটি সমস্যার সম্মুখীন হলাম। আমাদেরই একজন প্রকৃতি কর্মী, নাম অবিনাশ। নলবাড়ি মহাবিদ্যালয়ের ছাত্র। সকালবেলায় সে এসে আমি থাকা পর্যটন নিবাসের ঘরে উপস্থিত হল। জোরে সাইকেল চালিয়ে আসার জন্য তার কপাল থেকে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। সে এসেই আমাকে বলল ওদের গ্রামের কয়েকজন ছেলে রাতে জাল পেতে একটা ভাম ধরেছে। সেটা নাকি আজ মেরে ভোজ খাবে। তাই আমাকে যেতে হবে। আমি নবজিৎকে ফোন করলাম। নবজিৎ তখনও বিছানায়।নব জিৎ কে বললাম কিছু মনে কর না এটা সময়ের দাবি। আমি ছেলেটিকে পাঠিয়ে দিয়ে নবজিতের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।দশ মিনিটের মধ্যে নবজিৎ এসে উপস্থিত হল।ঘটনাস্থলে আমাকে এবং নবজিৎকে দেখতে পেয়ে ভাম ধরা ছেলেরা অবাক। নবজিৎ বলল প্রায় প্রত্যেকই তার ছাত্র। ওদের মধ্যে কোনো একজন জালে বন্দি হয়ে থাকা জন্তুটাকে মারার জন্য খোঁচাতে শুরু করেছে, কেউ লাঠি দিয়ে আঘাত করছে। আমাদের দেখে ওরা পিছিয়ে এল। নবজিত বলল— তোরা পাগল হয়েছিস? এই অবুঝ জন্তুটার ওপর এত অমানুষিক অত্যাচার করছিস কেন? তোরা হয়তো জানিস না, অরণ্য আইন অনুসারে তোরা শাস্তির যোগ্য। ছেলেরা নিশ্চুপ।ছেলেদের একজন অভিভাবক দৌড়ে এসে নবজিৎকে জিজ্ঞেস করল কে আপনি? আপনি কে?

 নবজিৎ রুখে দাঁড়িয়ে বলল— আমাকে এভাবে জিজ্ঞেস করার আপনি কে? এই জন্তুটা ধরতে আপনি ছেলেদের সাহায্য করেছেন নাকি?জালটা কি আপনার ?

 ছেলেরা দেখল ব্যাপারটা অন্যরকম দাঁড়াচ্ছে। স্যার না রেগে যান।রেগে গেলে কি অবস্থা হতে পারে সেটা তারা বিদ্যালয়ে দেখতে পেয়েছে।

 — স্যার!স্যার! আমাদের ভুল হয়েছে। আমরা না জেনেই—

 —কী ভুল হয়েছে তোদের? বন্য জন্তু,ইনি কি তার মালিক নাকি?

 অভিভাবকটি পুনরায় বেপরোয়া ভাব ভঙ্গিমায় উচ্চবাচ্য করতে লাগল। অভিভাবকের স্ত্রী দৌড়ে এসে মানুষটাকে হাতে ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল— ইনি আমাদের বাপুর স্যার, আপনি কেন এভাবে বলছেন। দেখি,আপনি এখান থেকে চলে আসুন।

 মানুষটার তখন চেতনা ফিরে এল। তিনি ধীরে ধীরে সেখান থেকে সরে পড়লেন।

  সেই সুযোগে আমি ছেলেদের বললাম— তোমাদের কেউ জন্তুটাকে চিনতে পেরেছ কি?

 —-স্যার ভাম।

  উপস্থিত ছেলের দলের মধ্যে একজন বলল।

 — তুমি ঠিকই বলেছ। এটাকে অসমিয়াতে তাড়ি খাওয়া ভাম বলা হয় । ইংরেজিতে এশিয়ান পাল্ম সিভেট। বৈজ্ঞানিক নাম পারাডকচারচ হারমাফ্রডাইটাচ। এই জন্তুটা এখন দুষ্প্রাপ্য জন্তুর সারিতে পড়ে। তোমাদের জন্তুটিকে ছেড়ে দিতে হবে। মাংসের জন্য হত্যা করার ফলে অসাম থেকে ভাম বিলুপ্ত হওয়ার অবস্থা হয়েছে। তোমরা এত ভালো ছেলে, বন্য জন্তু গুলিকে তোমাদের ভালোবাসা উচিত।এদের বাসস্থান বৃদ্ধি করার জন্য গাছ রোপণ করতে হবে। দেখতো প্রাণ রক্ষার জন্য কীভাবে সে সজল নয়নে তোমাদের দিকে তাকাচ্ছে। ভামটার এই অবস্থা দেখে তোমাদের মধ্যে কার কার খারাপ লাগছে হাত ওঠাও। একজন ছাড়া প্রত্যেকেই হাত উঠাল। যে ছেলেটি হাত উঠায়নি তাকে জিজ্ঞেস করলাম সে কেন হাত উঠায় নি। তার মতে পৃথিবীর সমস্ত কিছুই মানুষের ভোগের জন্য।ভামটা নিজের ভোগের জন্য ইঁদুর খায়।আমি তাকে বললাম তুমি কেন ভাবছ যে নিজে খাওয়াটাই ভোগ। সে ইঁদুর খায়, সেটা তার খাদ্য। ভাম নিজের ভোগের জন্য তোমার খাদ্য খায় না। তুমি তার গতিবিধির লক্ষ্য করে, তাকে সংরক্ষণ করে ও ভোগ করতে পার। পাখ-পাখালি, জীবজন্তু গুলি মরে না গেলে তুমি তোমার সন্তানরা কী নিয়ে ভোগ করবে। ছেলেটি নিশ্চুপ হয়ে গেল। আমি সবার উদ্দেশ্যে বললাম, তোমরা এসো, আমরা একসঙ্গে পাখ-পাখালি জীবজন্তু ইত্যাদির সংরক্ষণের জন্য কাজ করব। তারপর দেখবে হত্যা করার চেয়ে জীবন দান করায় বেশি ভোগ করা যায়। দশের হিতের জন্য ত্যাগের সঙ্গে কাজ কর। এখন তোমরা একে ছেড়ে দাও। দেবে তো?

 প্রতিবাদ করা ছেলেটিই প্রথম বলল– হ্যাঁ স্যার দেব।

 ওরা ভামটাকে ছেড়ে দেবার যতই চেষ্টা করছে, সে ততই জালটাতে আরও জড়িয়ে পড়ছে। জালটার এক মাথায় ধরে তুলে দিয়ে আমি একটু কষ্ট করে ভামটাকে ছাড়িয়ে আনলাম। ভামটা তীব্র বেগে দৌড়ে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ল।

 এই ঘটনা থেকে আমরা কয়েকটি শিক্ষা গ্রহণ করলাম। প্রথমে আমাদের স্থানীয়ভাবে কয়েকটি সজাগতা শিবিরের আয়োজন করতে হবে। আমরা একটি ফোন নাম্বার সবাইকে দিতে হবে যাতে এই ধরনের ঘটনার বিষয়ে কেউ কোনো খবর পেলেই আমাদের প্রকৃতি কর্মীদের সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দেবে।

 মাছ মারা জালে ফেঁসে যাওয়া সাপের উদ্ধার, খাঁচায় বন্দি করে রাখা পাখিকে মুক্ত করে দেওয়া এই ধরনের কয়েকটি কাজ আমাদের প্রকৃতি কর্মীরা শুরু করেছে। সাপের বিষয়ে প্রশিক্ষণ লাভ করা নবজিৎ বর্মন কর্মীদের সাহায্য করছে। ফোন পেলেই নবজিৎ দৌড়ে আসে। নতুন নতুন কর্মগাঁথুনির মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে অরণ্য গ্রাম এবং পর্যটন নিবাসের কাজ।

 আজ রবিবার। আজ পর্যটক নিবাস এবং অরণ্য গ্রাম পরিচালনা করার জন্য দুটি কমিটি গঠন করার কথা। সময় দেওয়া হয়েছে এগারোটার সময়। নয়টা থেকে প্রকৃতি কর্মীরা ইতিমধ্যে রোপণ করা প্রতিটি গাছের চারার দেখাশোনা করবে। গোড়ায় গজিয়ে ওঠা জঙ্গল পরিষ্কার করবে। বেড়াগুলি মেরামত করবে। কোথাও কোনো চারা যদি মরে যায় তাহলে সেই জায়গায় নতুন চারা লাগাবে। এগারোটার সময় প্রত্যেকেই মিলিত হবে সাংগঠনিক ভিত্তি সবল করার জন্য। অচ্যুত ,পুলক এবং রাতুল ইতিমধ্যে অভয়া পুরীতে গিয়ে শৈলেশদার অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে। আমি তাদের নিয়মিত খবরাখবর করছি।

 সংশ্লিষ্ট প্রতিটি ব্যক্তির তৎপরতায় পর্যটক নিবাস উদ্বোধন করার জন্য প্রায় প্রস্তুত হয়ে উঠেছে।


Registration (Online)

Trainee REGISTRATION (ONLINE)

                                                                                    👇           👉             Click here for registration...